যশোরের বাঘারপাড়ায় চিত্রা নদী খননের মাটি দীর্ঘদিন ধরে সরানো না হওয়ায় দুই পাড়ের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। ভুক্তভোগীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে মাটি বিক্রির স্পট নিলাম আহবান করা হয়। কিন্তু বাঘারপাড়া উপজেলা প্রশাসন মানহীন মাটির বেশি রেট দেয়ায় হট্টগোলে তা ভেস্তে গেছে। মাটি ক্রয় করেননি কেউ।
এ পরিস্থিতিতে আকাশে মেঘ দেখলেই নদী পড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ বৃষ্টির পানিতে মাটি ধুয়ে ডুবে যাবে নদী তীরবর্তী ধর্মগাতী ও ঘোপদুর্গাপুর এলাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যশোর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুন মাসে নড়াইলের গড়ের বাজার থেকে যশোরের বাঘারপাড়া খাজুরা পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কিলোমিটার এলাকায় নদী পুনঃখনন শুরু করে পাউবো। কিন্তু খননকৃত মাটি নদীর তীরবর্তী লোকালয়ে ফেলে রাখায় নতুন করে বিপত্তি সৃষ্টি হয়। শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, খননের মাটি ফেলায় ধর্মগাতী ও ঘোপ দুর্গাপুর গ্রামের নদীতীরবর্তী অন্তত দেড় শতাধিক পরিবার চরম বিপাকে পড়েছে। অনেকের বসতভিটা, রান্নাঘর, গোয়ালঘর ও টিউবওয়েল মাটির নিচে চাপা পড়েছে।
ধর্মগাতী গ্রামের বাসিন্দা বাসন্তী বিশ্বাস বলেন, আমাদের বাথরুম, গোয়ালঘর আর টিউবওয়েল সব মাটিতে ঢেকে গেছে। এখানে বসবাস করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
একই গ্রামের সখি রানী অভিযোগ করে বলেন, নদীর ওপারে বড়লোকরা নদীর জায়গা দখল করে পাঁচ-ছয়তলা ভবন বানিয়েছে। সেখানে মাটি ফেলা হয়নি। অথচ আমাদের মালিকানার জমিতে নদী খননের মাটি ফেলে আমাদের ঘিরে ফেলা হয়েছে।
শুধু বাসন্তী বিশ্বাস বা সখি রানী নন-রূপালী বিশ্বাস, রাধা রানী বিশ্বাস, পরিতোষ বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস, বিমল সরকার, বলরাম সরকারসহ ধর্মগাতী ও ঘোপ দুর্গাপুর গ্রামের দেড় শতাধিক মানুষ কার্যত বন্দি জীবনযাপন করছেন। অনেক বাড়ির চারপাশে মাটির ঢিবি তৈরি হওয়ায় চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
কোথাও কোথাও বাথরুম, গোয়ালঘর ও টিউবওয়েল পুরোপুরি মাটির নিচে চাপা পড়েছে। দূর থেকে এখন আর বোঝার উপায় নেই যে সেখানে মানুষের বসতি রয়েছে। কয়েকশ’ গাছও কেটে ফেলা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
ক্ষতিগ্রস্ত রুনু বেগম বলেন, নদী খনন হোক, সেটা আমরা চাই। কিন্তু সেই মাটি আমাদের বাড়ির ওপর ফেলে দেওয়া হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে আমরা কীভাবে এখানে থাকব ?
বলরাম সরকার বলেন, বাথরুম বা টিউবওয়েলের পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। গত বৃহস্পতিবার বৃষ্টি হলে ঘরের বারান্দা পর্যন্ত পানি উঠে যায়।
চিত্রা নদীর তীরে কয়েকটি স্থানে জনদুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ মুখার্জী। তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসন টেন্ডারের মাধ্যমে খননকৃত মাটি বিক্রি করতে পারে। এ লক্ষ্যে গত ১০ মার্চ স্পট নিলাম আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু দর-দাম নিয়ে হট্টগোল সৃষ্টি হওয়ায় নিলাম স্থগিত হয়ে গেছে। ঈদের পর পুনরায় স্পট নিলাম হবে।
এদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নদী খনন ও খননকৃত মাটি নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা ইতোমধ্যে পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন। তারা দ্রুত মাটি সরিয়ে জনদুর্ভোগ লাঘবের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে উপজেলা প্রশাসন কোয়ালিটিবিহীন মাটি বেশি দামে বিক্রির নামে সময়ক্ষেপণ করে এলাকায় দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
একটি সূত্রের দাবি, এখানকার মাটির গুণাগণ মান ভালো না। মাটির কোয়ালিটি না থাকায় উপযুক্ত দাম মেলে না। কিন্তু বাঘারপাড়া ইউএনও ভুপালী সরকার ১০ মার্চের নিলামে মাটির সেফটি দেড় টাকা রেট দেন। আর ঠিকাদাররা রেট দেন ৪৫ পয়সা। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, রেট বেশি হলে সরকারের কোষাগারে বেশি অর্থ জমা হবে ঠিকই। কিন্তু সেই অপেক্ষায় থাকলে আমাদের পরিণতি আরো খারাপ হবে।
এ বিষয়ে বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভুপালী সরকার বলেন, সরকারি নিয়ম মেনেই মাটি বিক্রির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিষয়টি সমাধানে প্রশাসন গুরুত্বসহকারে কাজ করছে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

