যশোরের বাজারে গেলেই এখন একটু থমকে যেতে হচ্ছে ক্রেতাদের। সবজির ঝুড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে দাম বুঝি সহনীয়ই আছে। কিন্তু হাত বাড়ালেই ধাক্কা লাগছে লাউয়ে। একটা ভালো লাউ কিনতে গুনতে হচ্ছে ৮০ টাকা। শুধু লাউ নয়, ইলিশ মাছ আর খামারের মুরগির দামও সাধারণ মানুষের জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোববার যশোর শহরের বড় বাজার ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে।
শীতকাল মানেই লাউয়ের ভরপুর সময়। সাধারণত এই সময় বাজারে লাউ সস্তা থাকে। কিন্তু যশোরের বাজারে তার উল্টো চিত্র। মাছ ব্যবসায়ী পিয়ার মুহাম্মদ জানালেন, তিনি নিজেও লাউ কিনতে এসে অবাক হয়েছেন। ভরা মৌসুমেও ৮০ টাকায় লাউ কিনতে হবে, এটা তিনি ভাবেননি।
বড় বাজার মাছবাজার রোডের কাঁচামালের আড়তদার মো. আলাউদ্দীন বললেন, কুয়াশার কারণে লাউ চাষে বড় ক্ষতি হয়েছে। ক্ষেতেই অনেক লাউ নষ্ট হয়ে গেছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। তাই বাজারে লাউয়ের দাম এখন অস্বাভাবিক।
লাউ ছাড়া বেশির ভাগ সবজির দামে কিন্তু কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। বড় বাজার এইচ এম এম রোডের খুচরা সবজি বিক্রেতা কৃষ্ণ চন্দ্র দাস বললেন, গত সপ্তাহের তুলনায় বেশ কয়েকটি সবজির দাম কমেছে। এতে ক্রেতারা অন্তত কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন।
বর্তমানে বেগুন বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৫০ টাকায়, শসা ৮০ টাকা, কুশি ৫০ টাকা, টমেটো ৪০ টাকা এবং পালংশাক ২০ টাকা কেজি দরে। এসব সবজির দাম আগের সপ্তাহের চেয়ে গড়ে ১০ টাকা করে কমেছে।
বাজারে এখন ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৫০ টাকায়। গাজর ও মুলা ৪০ টাকা, শিম ৩০ টাকা, পেঁয়াজকলি ২০ টাকা। লাউ মানভেদে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নতুন আলুর দাম গত সপ্তাহে কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে এখনো একই আছে। নতুন আলু ২৫ টাকা আর পুরোনো আলু ২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম ৪০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৮০ টাকায়।
কাঁচামালের আড়তদার শাহাবুদ্দিন মাতুব্বর বললেন, বাজারে সবজির সরবরাহে আপাতত কোনো ঘাটতি নেই। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আগামী দুই মাস শীতকালীন সবজির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। এতে সামনে সবজির দাম আরও স্থিতিশীল হওয়ার আশা করা যায়।
সবজিতে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও মুরগির বাজারে সেই স্বস্তি নেই। খামারের মুরগির দাম গত সপ্তাহে বাড়ার পর আর কমেনি। বড় বাজার মুরগিবাজারের খুচরা বিক্রেতা আরিফুল ইসলাম মিলন জানান, রোববার ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে কেজি প্রতি ১৮০ টাকায়। সোনালি মুরগির দাম ২৬০ টাকা আর লেয়ার মুরগি বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকা কেজি দরে।
অনেক পরিবার এখন সপ্তাহে একদিন মুরগি কিনতেও হিসাব কষছে। তবে সামান্য স্বস্তির খবর হলো ডিমের দাম কিছুটা কমেছে। এই সপ্তাহে খামারের মুরগির ডিম প্রতি হালি ২ টাকা কমে ৩৪ থেকে ৩৬ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
যশোরের বাজারে ইলিশ মাছ মানেই আলাদা উত্তেজনা। কিন্তু সেই উত্তেজনা এখন অনেকের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। রোববার খুচরা মাছ বিক্রেতা এরশাদ আলী জানান, এক কেজির বেশি ওজনের নদীর ইলিশ বিক্রি হয়েছে কেজি প্রতি ৩ হাজার টাকায়। ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকায়।
আরও ছোট আকারের ইলিশ, অর্থাৎ ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম কেজিতে ১ হাজার টাকা। সাগরের ইলিশ, যেগুলো তিন পিসে এক কেজি হয়, সেগুলো বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকায়। এসব দাম শুনে অনেক ক্রেতাই ইলিশের দোকান থেকে ফিরে যাচ্ছেন।
ইলিশের পাশাপাশি অন্যান্য মাছের দামও কম নয়। খুচরা মাছ বিক্রেতা আব্দুল লস্কর জানালেন, গলদা চিংড়ি আকারভেদে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি শিং মাছের দাম ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। চাষের শিং তুলনামূলক সস্তা, ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি।
পারসে মাছ বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। বেলে মাছ ৪০০ টাকা, ট্যাংরা মাছ ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। পুঁটি মাছের দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। দেশি কৈ মাছ বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। রুই মাছের দাম তুলনামূলক কম, কেজি প্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা।
সব মিলিয়ে যশোরের বাজারে এখন মিশ্র চিত্র। একদিকে কিছু সবজির দাম কমে স্বস্তি দিচ্ছে। অন্যদিকে লাউ, ইলিশ আর মুরগির দাম সাধারণ মানুষের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই বলছেন, বাজারে গেলেই তালিকা ছোট করতে হচ্ছে। আগে যেখানে সপ্তাহে দুই দিন মাছ কেনা যেত, এখন সেখানে এক দিনও ভাবতে হয়।
ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সামনে সরবরাহ বাড়লে কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে। তবে আপাতত যশোরের বাজারে কেনাকাটা করতে গেলে হিসাব-নিকাশ করেই হাঁটতে হচ্ছে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

