Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিখালি চোখে দেখা যাবে বৃহস্পতিগ্রহ: জানুন কবে, কখন ও কীভাবে উপভোগ করবেন...

খালি চোখে দেখা যাবে বৃহস্পতিগ্রহ: জানুন কবে, কখন ও কীভাবে উপভোগ করবেন এই বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য

ব্যস্ত জীবনের মাঝে কয়েক মিনিট সময় বের করে আকাশের দিকে তাকান। হয়তো সেই মুহূর্তই আপনাকে আবার বিস্মিত করবে, আবার মনে করিয়ে দেবে—এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কতটা সৌভাগ্যবান দর্শক।

Share

মহাকাশ মানেই রহস্য, বিস্ময় আর অজানা রোমাঞ্চ। আকাশের দিকে তাকালেই মনে হয়, কত কিছু লুকিয়ে আছে সেখানে। আমরা অনেকেই খালি চোখে মঙ্গল বা শুক্রগ্রহ দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু সৌরমণ্ডলের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতিকে খালি চোখে এত স্পষ্টভাবে দেখার সুযোগ খুব ঘনঘন আসে না। এবার ঠিক সেই বিরল সুযোগই সামনে এসেছে। জানুয়ারির নির্দিষ্ট দু’টি দিনে আকাশে উজ্জ্বলভাবে ধরা দেবে বৃহস্পতিগ্রহ, যা সাধারণ মানুষও সহজেই দেখতে পারবেন।

এই ঘটনা শুধু জ্যোতির্বিদদের জন্য নয়। আকাশ দেখতে ভালোবাসেন এমন যে কারও জন্যই এটি এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হতে চলেছে।

বৃহস্পতিগ্রহ কেন এত আলো ছড়ায়

বৃহস্পতি মূলত একটি গ্যাসীয় গ্রহ। এর চারপাশ ঘন মেঘে ঢাকা। এই মেঘ সূর্যের আলো খুব শক্তভাবে প্রতিফলিত করে। ঠিক যেন বিশাল এক প্রাকৃতিক আয়না। ফলে পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অবস্থান করলেও বৃহস্পতি আকাশে অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখায়।

এই প্রতিফলিত আলো এতটাই তীব্র হয় যে, পরিষ্কার আকাশ থাকলে শহরের আলো দূষণের মধ্যেও বৃহস্পতিকে সহজে চিহ্নিত করা যায়। অনেক সময় এটি আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তুর মতো মনে হয়, চাঁদ ও শুক্রগ্রহ বাদ দিলে।

কখন দেখা যাবে বৃহস্পতিগ্রহ সবচেয়ে উজ্জ্বল অবস্থায়

জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসেবে আগামী ৯ জানুয়ারি ও ১০ জানুয়ারি বৃহস্পতিগ্রহ থাকবে তার সবচেয়ে উজ্জ্বল অবস্থায়। এই সময়ে পৃথিবী ও বৃহস্পতির মধ্যবর্তী দূরত্ব কমে আসবে প্রায় ৬৩৩ মিলিয়ন কিলোমিটারে, অর্থাৎ ৬৩ কোটি ৩০ লক্ষ কিলোমিটার।

সাধারণত এই দূরত্ব থাকে প্রায় ৭১৪ মিলিয়ন কিলোমিটার। দূরত্ব কমে যাওয়ার কারণেই বৃহস্পতিকে এবার খালি চোখে আরও স্পষ্ট ও উজ্জ্বলভাবে দেখা যাবে। এমন সুযোগ প্রতি বছর আসে না, তাই এই দু’দিন আকাশের দিকে তাকানো একেবারেই মিস করা উচিত নয়।

পৃথিবীর কোন কোন জায়গা থেকে দেখা যাবে

সবচেয়ে ভালো খবর হলো, পৃথিবীর এমন কোনও জায়গা নেই যেখান থেকে এই সময় বৃহস্পতিকে দেখা যাবে না। অর্থাৎ ভারত, বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের সব অঞ্চল থেকেই এই দৃশ্য উপভোগ করা সম্ভব।

গ্রাম হোক বা শহর, পাহাড় হোক বা সমতল—যেখানে আকাশ খানিকটা খোলা, সেখান থেকেই বৃহস্পতিকে দেখা যাবে। শুধু আকাশ পরিষ্কার থাকা জরুরি। মেঘ না থাকলে সন্ধ্যার পর আকাশের দিকে তাকালেই চোখে পড়বে এই বিশাল গ্রহটি।

কোন সময় আকাশের দিকে তাকাবেন

সন্ধ্যা নামার পরই বৃহস্পতিগ্রহ আকাশে দৃশ্যমান হতে শুরু করবে। সূর্য অস্ত যাওয়ার কিছুক্ষণ পর পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে উজ্জ্বল একটি আলোর বিন্দু চোখে পড়বে। সেটিই বৃহস্পতি।

এটি কোনও নক্ষত্র নয়, কারণ নক্ষত্রের মতো এটি ঝিকমিক করবে না। বরং স্থির, শক্ত আলো ছড়াতে দেখা যাবে। যারা আগে কখনও গ্রহ চেনার চেষ্টা করেননি, তারাও সহজেই এই পার্থক্য বুঝতে পারবেন।

খালি চোখে কী কী দেখা যাবে

খালি চোখে বৃহস্পতিকে একটি উজ্জ্বল আলোর বিন্দু হিসেবেই দেখা যাবে। তবে এর বিশালত্ব ও উজ্জ্বলতা সহজেই বোঝা যাবে। এটিই সৌরমণ্ডলের সবচেয়ে বড় গ্রহ।

আরও মজার বিষয় হলো, বৃহস্পতির চারটি প্রধান উপগ্রহ—আইও, ইউরোপা, গ্যানিমিড ও ক্যালিস্টো। এগুলোকে খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। তবে খুব বেশি শক্তিশালী যন্ত্রের দরকারও নেই। হালকা ক্ষমতার একটি বাইনোকুলার বা ছোট টেলিস্কোপ থাকলেই এই উপগ্রহগুলো আলাদা আলাদা আলোর বিন্দু হিসেবে দেখা যাবে।

যারা আগে কখনও টেলিস্কোপে আকাশ দেখেননি, তাদের জন্য এটি হতে পারে এক দারুণ প্রথম অভিজ্ঞতা।

সাধারণ মানুষের জন্য কেন এই সুযোগ বিশেষ

আমরা অনেকেই বইয়ে, পাঠ্যবইয়ে বা ইন্টারনেটে বৃহস্পতির ছবি দেখেছি। জানি, এটি কত বিশাল, কত শক্তিশালী, কত রহস্যে ভরা। কিন্তু নিজের চোখে আকাশে তাকিয়ে সেই গ্রহটিকে দেখা—এই অনুভূতির সঙ্গে কোনও ছবির তুলনা হয় না।

এই সুযোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কত বিশাল এক মহাবিশ্বের ছোট্ট অংশ। সন্ধ্যাবেলা বাড়ির ছাদে, মাঠে বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকানো মানে শুধু একটি গ্রহ দেখা নয়। এটি এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি, এক ধরনের বিস্ময়।

বৃহস্পতিগ্রহ নিয়ে কিছু মজার তথ্য

বৃহস্পতি এতটাই বড় যে, এর ভেতরে পৃথিবীর মতো এক হাজারেরও বেশি গ্রহ ঢুকে যেতে পারে। এর সবচেয়ে বিখ্যাত বৈশিষ্ট্য হলো ‘গ্রেট রেড স্পট’, যা আসলে একটি বিশাল ঝড়। এই ঝড় কয়েকশো বছর ধরে চলছে।

এছাড়াও বৃহস্পতির শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ও অসংখ্য উপগ্রহ একে বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয় করে তুলেছে। এবার সেই গ্রহই আমাদের চোখের সামনে আকাশে ধরা দিতে চলেছে।

কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন এই দৃশ্য দেখার জন্য

খুব বেশি প্রস্তুতির দরকার নেই। শুধু এই কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলেই হবে। সন্ধ্যার পর খোলা জায়গায় থাকুন। আকাশ পরিষ্কার কিনা দেখুন। সম্ভব হলে শহরের অতিরিক্ত আলো থেকে একটু দূরে থাকুন।

যদি বাইনোকুলার বা ছোট টেলিস্কোপ থাকে, তা হলে আরও ভালো। না থাকলেও কোনও সমস্যা নেই। খালি চোখেই বৃহস্পতিকে দেখার আনন্দ কম নয়।

শেষ কথা

এমন মহাজাগতিক দৃশ্য বারবার আসে না। ৯ ও ১০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আকাশের দিকে তাকানো মানে ইতিহাসের এক ছোট্ট মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া। সৌরমণ্ডলের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতিকে নিজের চোখে দেখা—এ এক আলাদা অনুভূতি।

ব্যস্ত জীবনের মাঝে কয়েক মিনিট সময় বের করে আকাশের দিকে তাকান। হয়তো সেই মুহূর্তই আপনাকে আবার বিস্মিত করবে, আবার মনে করিয়ে দেবে—এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কতটা সৌভাগ্যবান দর্শক।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন