Homeনির্বাচনবিএনপির ৫১ দফা ও ৯ প্রতিশ্রুতি: ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’ ইশতেহারে কী...

বিএনপির ৫১ দফা ও ৯ প্রতিশ্রুতি: ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’ ইশতেহারে কী আছে?

Share

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ঘোষণা করেছে তাদের বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচনী ইশতেহার। “করবো কাজ, গড়বো দেশ” এই প্রত্যয়ে তৈরি ইশতেহারের মূল স্লোগান রাখা হয়েছে “সবার আগে বাংলাদেশ”। এই ইশতেহারের মাধ্যমে বিএনপি একটি দায়িত্বশীল, মানবিক ও ন্যায্য রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা তুলে ধরেছে, যেখানে উন্নয়ন হবে কাজের মাধ্যমে, কথার মাধ্যমে নয়।

রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এটি কেবল নির্বাচনের জন্য ঘোষিত প্রতিশ্রুতি নয়, বরং আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার নকশা।

ইশতেহারের ভিত্তি ও দর্শন

বিএনপির এবারের ইশতেহার গড়ে উঠেছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দর্শনের সমন্বয়ে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্রচিন্তা, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন–২০৩০ এবং তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা—এই তিনের আলোকে ইশতেহারের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। দলটির দাবি, এই সমন্বিত দর্শনই বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করবে।

৫১ দফা কর্মসূচি ও ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি

বিএনপি তাদের ইশতেহারকে পাঁচটি অধ্যায়ে ভাগ করেছে। এই অধ্যায়গুলোর মধ্যে মোট ৫১টি দফা কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে দলটি।

১. ফ্যামিলি কার্ডে সামাজিক সুরক্ষা

নিম্নআয় ও প্রান্তিক পরিবারের জীবনযাত্রা সহজ করতে চালু হবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে বিএনপি।

২. কৃষক কার্ডে কৃষকের ন্যায্য অধিকার

কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চালু হবে ‘কৃষক কার্ড’। এই কার্ডের আওতায় কৃষকরা পাবেন ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণের সুবিধা। মৎস্য ও পশুপালন খাতের উদ্যোক্তারাও এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হবেন।

৩. মানবিক ও দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা

সারাদেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিয়ে একটি মানবিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মা ও শিশুর জন্য বিশেষায়িত সেবা জোরদার করা হবে।

৪. বাস্তবমুখী শিক্ষা সংস্কার

নতুন শিক্ষানীতির মাধ্যমে শিক্ষাকে বাস্তব দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রযুক্তি সহায়তা বাড়ানো হবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে।

৫. তরুণ ও কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার

তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।

৬. ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা

খেলাধুলাকে জীবিকা হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রীড়াবিদ তৈরির পথ সুগম হবে।

৭. পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষা

আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন বা পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

৮. ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থান

সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ কর্মসূচি চালু করা হবে।

৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও রপ্তানি সম্প্রসারণ

আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে পেপাল চালুর পাশাপাশি বাংলাদেশকে ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ইশতেহারের পাঁচটি মূল অধ্যায়
রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসন

প্রথম অধ্যায়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের শাসন এবং দুর্নীতি দমনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।

সামাজিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসন

এই অধ্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

অর্থনীতি পুনর্গঠন ও ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য

ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন করে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে বিএনপি। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং সংস্কার এবং আইটি ও ব্লু ইকোনমির উন্নয়ন এই অধ্যায়ের মূল দিক।

অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন

চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা, উত্তরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার জন্য বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ঢাকাকে নিরাপদ ও টেকসই নগরীতে রূপান্তরের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

ধর্ম, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

শেষ অধ্যায়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার, সংস্কৃতি চর্চা এবং স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

নতুন রাষ্ট্রীয় চুক্তির অঙ্গীকার

বিএনপি বলছে, এই ইশতেহার প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং ন্যায়, মানবিকতা ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দলিল। দলটির মতে, ক্ষমতা নয়, জনগণই রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়াই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সভাপতিত্ব করেন এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান সঞ্চালনা করেন। এতে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন