বাংলাদেশে স্কুলে ভর্তি নিয়ে নতুন করে ঝড় উঠেছে। কারণ, সরকার ঘোষণা দিয়েছে—ভর্তির ক্ষেত্রে আর লটারি পদ্ধতি থাকবে না। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই শুরু হয়েছে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, এমনকি উদ্বেগও।
একটা ছোট শিশুর জীবনের প্রথম স্কুলে ভর্তি—এটা এমন একটা সময়, যেখানে আনন্দ আর স্বপ্ন থাকার কথা। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই শুরুটা কি আবার প্রতিযোগিতা আর চাপ দিয়ে ভরে যাবে?
লটারি পদ্ধতি বাতিল: আসলে কী পরিবর্তন আসছে
আগে অনেক ক্ষেত্রে স্কুলে ভর্তির জন্য লটারি ব্যবহার করা হতো। মানে, ভাগ্যের উপর নির্ভর করে ছাত্রছাত্রী নির্বাচন। এতে অন্তত একটা বিষয় নিশ্চিত ছিল—সবাই সমান সুযোগ পেত।
কিন্তু এখন সিদ্ধান্ত এসেছে, লটারির বদলে আবার পরীক্ষা নেওয়া হতে পারে। যদিও বলা হচ্ছে, ছোটদের জন্য পরীক্ষা সহজ হবে। তবুও, অভিভাবকদের মনে একটা ভয় কাজ করছে—এটা কি আবার পুরনো প্রতিযোগিতার দরজা খুলে দেবে?
ভাবো তো, পাঁচ-ছয় বছরের একটা বাচ্চা। সে ঠিকমতো খেলাধুলা আর গল্পের দুনিয়ায় থাকার বয়সে, হঠাৎ তাকে পরীক্ষার টেবিলে বসতে বলা হচ্ছে। এটা কি সত্যিই স্বাভাবিক?
কেন অনেকেই ভর্তি পরীক্ষার বিরুদ্ধে
অনেক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ আর অভিভাবক মনে করেন, এত ছোট বয়সে পরীক্ষা নেওয়া ঠিক না।
কারণটা খুব সহজ। এই বয়সে শিশুরা আসলে শিখছে কীভাবে কথা বলতে হয়, বন্ধু বানাতে হয়, পৃথিবীটাকে চিনতে হয়। তাদের জ্ঞান তখনো গড়ে উঠছে। এই সময় তাদের “মেধা” মাপা—এটা অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক।
আরেকটা বড় সমস্যা হচ্ছে চাপ। ছোট্ট একটা বাচ্চা, যার কাছে পরীক্ষা মানেই ভয়—সে যদি শুরুতেই এই চাপ পায়, তাহলে তার শেখার আগ্রহটাই কমে যেতে পারে।
কোচিং বাণিজ্যের ভয়: নতুন করে কি শুরু হবে?
এই সিদ্ধান্তের পর সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটা হলো কোচিং।
আগে যখন ভর্তি পরীক্ষা ছিল, তখন অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে বাচ্চাদের কোচিংয়ে পাঠাতেন। এখন আবার যদি পরীক্ষা চালু হয়, তাহলে সেই পুরনো দৃশ্য কি ফিরে আসবে?
ধরা যাক, পাশের বাসার একটা বাচ্চা কোচিং করছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই আরেকজন অভিভাবক ভাববেন—“আমার বাচ্চা পিছিয়ে যাবে না তো?” এভাবেই একটা চাপ তৈরি হয়।
ফলাফল? পাঁচ-ছয় বছরের শিশুরাও কোচিংয়ের চাপে পড়ে যায়।
লটারির পক্ষে যারা, তারা কী বলছেন
অনেকেই বলছেন, লটারি পদ্ধতি পুরোপুরি খারাপ ছিল না।
কারণ, এতে অন্তত ধনী-গরিব সবার জন্য সমান সুযোগ থাকত। কোনো কোচিং, কোনো আলাদা প্রস্তুতির দরকার হতো না।
বিশেষ করে প্রথম শ্রেণির মতো এন্ট্রি লেভেলে, লটারি একটা নিরপেক্ষ পদ্ধতি হিসেবে কাজ করত। কেউ বাড়তি সুবিধা নিতে পারত না।
তবে এটাও ঠিক, লটারির কারণে অনেক সময় “ভালো স্কুল” আর “খারাপ স্কুল” এর পার্থক্যটা থেকেই যেত।
বিকল্প ভাবনা: ক্যাচমেন্ট এরিয়া ভিত্তিক ভর্তি
এখন অনেক বিশেষজ্ঞ নতুন একটা পথের কথা বলছেন—ক্যাচমেন্ট এরিয়া ভিত্তিক ভর্তি।
মানে, যে এলাকায় তুমি থাকো, সেই এলাকার স্কুলেই ভর্তি হবে। এতে করে দূরের “নামকরা” স্কুলে যাওয়ার চাপ কমে যাবে।
একটা সহজ উদাহরণ দেই। ধরো, তোমার বাড়ির পাশে একটা ভালো মানের স্কুল আছে। তখন আর তোমাকে শহরের অন্য প্রান্তে দৌড়াতে হবে না।
এই পদ্ধতিতে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—সব স্কুলের মান উন্নত করার চাপ তৈরি হবে। সরকারও বাধ্য হবে প্রতিটি স্কুলকে ভালো করতে।
শিক্ষামন্ত্রীর যুক্তি: কেন লটারি ঠিক নয়
শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, লটারি কোনোভাবেই শিক্ষার মানদণ্ড হতে পারে না। তার মতে, ভর্তি মানে একটা যাচাই প্রক্রিয়া থাকা দরকার।
তিনি এটাও বলেছেন, ছোটদের জন্য পরীক্ষা খুব সহজভাবে নেওয়া হবে। এমন কিছু থাকবে না, যা তাদের জন্য কঠিন।
আর কোচিং বাণিজ্য নিয়ে যে ভয়—সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
কিন্তু বাস্তবে কী হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া: মানুষ কী ভাবছে
এই সিদ্ধান্তের পর সামাজিক মাধ্যমে নানা মতামত এসেছে।
অনেকেই সরাসরি বলেছেন—প্রথম শ্রেণিতে পরীক্ষা চালু করা মানে কোচিং ব্যবসাকে উৎসাহ দেওয়া।
আবার কেউ বলেছেন, লটারি আর পরীক্ষা—দুটোই সমস্যার সমাধান না। আসল সমস্যা হচ্ছে স্কুলগুলোর মানের বৈষম্য।
কারণ, যতদিন কিছু স্কুল “সেরা” আর কিছু স্কুল “গড়পড়তা” থাকবে, ততদিন এই প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে না।
বাস্তব সমস্যা কোথায়?
আসলে সমস্যাটা খুব গভীরে।
আমরা সবাই চাই আমাদের সন্তান ভালো স্কুলে পড়ুক। কিন্তু “ভালো স্কুল” কেন আলাদা হয়ে দাঁড়ায়?
কারণ, সব স্কুলে সমান সুযোগ-সুবিধা নেই। কোথাও ভালো শিক্ষক, কোথাও ভালো পরিবেশ—আবার কোথাও এসবের অভাব।
এই অসমতাই পুরো সমস্যার মূল।
সামনে কী হতে পারে
যদি আবার ভর্তি পরীক্ষা চালু হয়, তাহলে খুব সম্ভবত কোচিং আবার বাড়বে।
আর যদি লটারি না থাকে, তাহলে অনেক অভিভাবক নিজেদের বাচ্চাকে এগিয়ে রাখতে বাড়তি চেষ্টা করবেন—যা শেষ পর্যন্ত শিশুর উপর চাপ হয়ে যায়।
অন্যদিকে, যদি ক্যাচমেন্ট এরিয়া পদ্ধতি চালু হয়, তাহলে হয়তো ধীরে ধীরে এই প্রতিযোগিতা কমতে পারে।
শিশুর স্বাভাবিক শৈশবটাই কি সবচেয়ে জরুরি নয়?
সব আলোচনা শেষে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা আসলে কী চাই?
একটা পাঁচ বছরের শিশুর জন্য সবচেয়ে জরুরি কী—পরীক্ষায় ভালো করা, নাকি আনন্দ নিয়ে শেখা?
ভাবলে দেখবে, স্কুলের শুরুটা যদি আনন্দময় হয়, তাহলে শেখার পথটাও সহজ হয়। কিন্তু শুরুতেই যদি চাপ, ভয় আর প্রতিযোগিতা ঢুকে যায়, তাহলে সেই পথটা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই সিদ্ধান্ত যাই হোক, সবচেয়ে আগে ভাবতে হবে শিশুর কথা। কারণ, আজকের এই ছোট্ট বাচ্চাটাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

