Homeবিশ্ব সংবাদনেপালে রাজনৈতিক চমক: সাবেক র‍্যাপশিল্পী বালেন্দ্র শাহ কি হচ্ছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী?

নেপালে রাজনৈতিক চমক: সাবেক র‍্যাপশিল্পী বালেন্দ্র শাহ কি হচ্ছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী?

Share

নেপালের রাজনীতিতে এবার যেন একেবারে ভিন্ন ধরনের গল্প তৈরি হচ্ছে। একজন সাবেক র‍্যাপশিল্পী, যিনি আবার রাজধানীর মেয়র হিসেবেও পরিচিত—তিনি এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে। এই মানুষটির নাম বালেন্দ্র শাহ, যাকে নেপালের মানুষ ভালোবেসে “বালেন” নামেই চেনে।

নেপালের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের ভোট গণনা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে যত ফলাফল সামনে আসছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বালেন্দ্র শাহ ও তার দল বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। অনেকেই বলছেন, যদি এই ধারা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, তাহলে নেপালের রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের সাক্ষী হতে পারে দেশটি।

এই নির্বাচন শুধু একজন নেতার উত্থানের গল্প নয়। বরং এটি নতুন প্রজন্ম বনাম পুরোনো রাজনীতির এক প্রতীকী লড়াই হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নেপালের সাধারণ নির্বাচনের পর ভোট গণনা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছে বালেন্দ্র শাহের দল, রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি), বেশিরভাগ আসনে শক্তভাবে লড়াই করছে।

বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, সরাসরি নির্বাচিত ১৬৫টি আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি জায়গায় এগিয়ে রয়েছে এই দল। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে তারা বড় সুবিধা পেতে পারে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বড় দুই দল—নেপালি কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল)—এই মুহূর্তে অনেকটা পিছিয়ে আছে।

এই নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এবং জনপ্রিয় নেতা গগন থাপা। কিন্তু ভোটের প্রাথমিক ফল বলছে, তরুণ ভোটারদের সমর্থন শাহের দিকেই বেশি গেছে।

নেপাল একটি পাহাড়ি দেশ। অনেক অঞ্চল খুবই দুর্গম। ফলে ভোট গণনার কাজ এখানে সাধারণত একটু ধীরগতিতে এগোয়।

দূরবর্তী এলাকাগুলো থেকে ব্যালট বাক্স আনতে অনেক সময় হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয়। তাই চূড়ান্ত ফলাফল জানতে কয়েক দিন সময় লেগে যেতে পারে।

এর আগে ২০২২ সালের নির্বাচনের সময়ও চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হতে দুই সপ্তাহের বেশি সময় লেগেছিল। তাই এবারের ফলাফলও আগামী সপ্তাহের আগে পুরোপুরি জানা নাও যেতে পারে।

৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ আসলে একজন অবকাঠামো প্রকৌশলী। তবে তার আরেকটি পরিচয় আছে, যা তাকে অনেক মানুষের কাছে আলাদা করে পরিচিত করেছে—তিনি একজন র‍্যাপ শিল্পী।

নেপালের হিপহপ জগত “নেফপ”-এ তিনি বেশ সক্রিয় ছিলেন। তার বেশ কিছু গান সামাজিক বার্তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে “বালিদান” নামের একটি গান ইউটিউবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। গানটির মূল বিষয় ছিল ত্যাগ এবং সমাজের পরিবর্তন।

এই সংগীতজগত থেকেই তিনি ধীরে ধীরে তরুণদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

পরবর্তীতে রাজনীতিতে এসে তিনি নিজেকে একজন পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।

গত বছর নেপালে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। প্রথমে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে আন্দোলনটি বড় আকার নেয়।

মানুষ তখন দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে।

এই আন্দোলনের সময় বালেন্দ্র শাহ প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানান। এতে তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে।

সেই বিক্ষোভে প্রায় ৭৭ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন। অনেকের মৃত্যু হয়েছিল পুলিশের গুলিতে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন নেতৃত্বের দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

বালেন্দ্র শাহ কখনোই নিজের বক্তব্য নিয়ে খুব বেশি রাখঢাক করেননি।

বিক্ষোভের সময় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে সরাসরি “সন্ত্রাসী” বলে উল্লেখ করেছিলেন। এমনকি তিনি অভিযোগ করেন যে ওলি দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।

এই ধরনের কঠোর মন্তব্য তাকে অনেকের কাছে সাহসী নেতা হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচনাও কম হয়নি।

কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন—একজন নেতা হিসেবে তিনি কতটা পরিমিত ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে পারবেন।

রাজনীতিতে আসার পর বালেন্দ্র শাহ সবচেয়ে বেশি পরিচিত হন কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে।

মেয়র থাকাকালীন তিনি রাজধানীর সড়ক পরিষ্কার রাখা এবং অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করার জন্য বেশ কঠোর পদক্ষেপ নেন।

রাস্তার হকার এবং অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান চালানো হয়। এতে শহরের অনেক জায়গা পরিষ্কার হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সমালোচনা করে।

তাদের অভিযোগ ছিল, এই অভিযান অনেক দরিদ্র মানুষের জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলেছে।

তবে তার সমর্থকরা বলেন, শহরকে সুশৃঙ্খল করতে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

এই নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঝাপা–৫ আসনে। এটি দীর্ঘদিন ধরে কেপি শর্মা ওলির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

কিন্তু ভোট গণনার বর্তমান চিত্র বলছে, এই আসনেও শাহ উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।

যদি শেষ পর্যন্ত তিনি এই আসনে জয়ী হন, তাহলে সেটি হবে রাজনৈতিকভাবে একটি বড় ধাক্কা।

কারণ বহু বছর ধরে এই অঞ্চলটি ওলির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় বালেন্দ্র শাহ খুব একটা গণমাধ্যমের সামনে আসেননি।

তিনি বেশিরভাগ সময় সাক্ষাৎকার দেওয়া এড়িয়ে গেছেন। এমনকি ভোটের দিনও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।

সেদিন তিনি তার পরিচিত কালো সানগ্লাস পরে সাংবাদিকদের ভিড় পেরিয়ে চলে যান।

নেপালের কিছু গণমাধ্যম আশঙ্কা করছে, তিনি যদি ক্ষমতায় আসেন তাহলে এই দূরত্ব হয়তো আরও বাড়তে পারে।

নেপালের পার্লামেন্টে মোট ২৭৫ জন সদস্য রয়েছে। এই সদস্যদের নির্বাচিত করার জন্য দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

প্রথমটি সরাসরি ভোটের মাধ্যমে। এতে ১৬৫ জন সদস্য নির্বাচিত হন। এখানে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই আসনটি জিতে নেন।

অন্যদিকে বাকি ১১০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে। অর্থাৎ কোনো দল জাতীয়ভাবে কত শতাংশ ভোট পেয়েছে, তার ভিত্তিতে তারা আসন পায়।

এই কারণে প্রতিটি ভোটার দুটি করে ভোট দেন।

এই নির্বাচনে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন। ভোটগ্রহণ শেষে কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছেন, প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ মানুষ প্রথমবার ভোট দিয়েছেন।

এই তরুণদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দলগুলো চাকরির সুযোগ, দুর্নীতি দমন এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, তরুণদের এই ভোটই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

গত তিন দশকে নেপালের রাজনীতি বারবার জোট সরকারের পরিবর্তন দেখেছে। সাধারণত কয়েকটি বড় দলই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

কিন্তু এবারের নির্বাচন কিছুটা আলাদা। নতুন দল, নতুন মুখ এবং অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

এমনকি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থী স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

এই পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অনেক নেপালি এখন নতুন ধারণা এবং নতুন নেতৃত্ব খুঁজছেন।

যদি বালেন্দ্র শাহ শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে তা শুধু একজন নেতার জয় হবে না। বরং এটি হবে নেপালের রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের সূচনা—যেখানে তরুণ নেতৃত্ব এবং নতুন ভাবনার জায়গা তৈরি হবে।

অনেকের কাছে এটি যেন এক নতুন অধ্যায়ের শুরু।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন