Homeবিশেষ প্রতিবেদননেপালে জেন জ়ি ঝড়! বলেন্দ্র শাহের ঐতিহাসিক জয়, ভেঙে পড়ল পুরনো রাজনীতি

নেপালে জেন জ়ি ঝড়! বলেন্দ্র শাহের ঐতিহাসিক জয়, ভেঙে পড়ল পুরনো রাজনীতি

Share

নেপালের রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা আর পুরনো দলগুলোর প্রভাবের মাঝে এবার সামনে উঠে এসেছে তরুণ প্রজন্মের শক্তি। জেন জ়ি বা নতুন প্রজন্মের আন্দোলনের ঢেউয়ে ভেসে নেপালের ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসছেন কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বলেন্দ্র শাহ।

নির্বাচনের ফলাফল বলছে, তাঁর নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) দেশের সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগোচ্ছে। এই ফলাফল শুধু একটি নির্বাচনের জয় নয়; বরং এটি নেপালের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

নেপাল গত কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ৩০ বারের বেশি সরকার পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রায় প্রতি বছরই ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নেপালের জন্য সবসময়ই বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল।

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা কমতে শুরু করে। দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা নিয়ে মানুষের অসন্তোষ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম মনে করতে শুরু করে যে পুরনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। এই অসন্তোষ থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় জেন জ়ি আন্দোলন।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে নেপালের রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় আসে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং কর্মসংস্থানের দাবিতে তরুণদের বড় আন্দোলন শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।

এই আন্দোলনের মূল মুখ হয়ে ওঠেন বলেন্দ্র শাহ। তরুণদের কাছে তিনি পরিচিত ‘বলেন’ নামে। তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলন এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার ক্ষমতা হারায়।

এই ঘটনার পর থেকেই নেপালের রাজনীতিতে নতুন এক শক্তির উত্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নেপালের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস’-এর মোট আসন সংখ্যা ২৭৫। এর মধ্যে ১৬৫টি আসনে সরাসরি ভোট হয় এবং বাকি ১১০টি আসনে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে সদস্য নির্বাচন করা হয়।

নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল বলছে, সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে প্রায় ১১২টি আসন জিততে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। নেপালের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি একটি রেকর্ড ফলাফল।

অন্যদিকে পুরনো বড় দলগুলো এই নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউএমএল) মাত্র ১২টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। নেপালের প্রাচীন রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেস পেয়েছে প্রায় ১০টি আসন। আর প্রাক্তন মাওবাদী গেরিলা নেতা পুষ্পকমল দহাল, যিনি প্রচণ্ড নামে পরিচিত, তাঁর দল পেয়েছে মাত্র কয়েকটি আসন।

এই ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে নেপালের ভোটাররা এবার নতুন নেতৃত্বকে সুযোগ দিতে চাইছেন।

বলেন্দ্র শাহের রাজনৈতিক যাত্রা সত্যিই বেশ আলাদা। তিনি প্রথমে পরিচিতি পান একজন র‌্যাপার গায়ক হিসেবে। পরে তিনি সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সরব হতে শুরু করেন।

২০২২ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে তিনি নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে জয় পান। তখন থেকেই তরুণদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে।

মেয়র হিসেবে কাজ করার সময় তিনি দুর্নীতি কমানো, নগর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করেন। এই কাজগুলোই তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে বড় একটি মুখ করে তোলে।

পরে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিতে যোগ দেন এবং এবার সেই দলের নেতৃত্বেই জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন।

এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তরুণ ভোটারদের ভূমিকা। নেপালের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। তাদের অনেকেই পুরনো রাজনীতির প্রতি বিরক্ত ছিল।

বলেন্দ্র শাহ তাদের সামনে একটি নতুন বিকল্প হিসেবে দাঁড়ান। তাঁর প্রচারণায় ছিল স্বচ্ছ রাজনীতি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করার প্রতিশ্রুতি।

ফলে জেন জ়ি প্রজন্মের বিপুল সমর্থন তিনি পান। এই সমর্থনই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলে।

ওলি সরকারের পতনের পর নেপালে আবার রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবিও ওঠে। রাজেন্দ্র লিংডেনের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি সেই দাবিতে আন্দোলন চালায়।

কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল দেখায় যে সাধারণ মানুষ সেই পথে যেতে চায় না। এই দলটি মাত্র একটি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ ভোটাররা রাজতন্ত্র নয়, বরং গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই নতুন নেতৃত্বকে বেছে নিতে চেয়েছেন।

নেপালের তরাই বা সমতল অঞ্চল অতীতে মধেশী রাজনৈতিক দলগুলোর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। আগের অনেক নির্বাচনে ওই অঞ্চল থেকে মধেশী দলগুলো ভালো ফল করেছিল।

কিন্তু এবার সেই চিত্রও বদলে গেছে। তরাই অঞ্চলের অনেক আসনেই রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এতে বোঝা যায় যে পরিবর্তনের হাওয়া শুধু শহরেই নয়, গ্রাম ও সীমান্ত এলাকাতেও পৌঁছে গেছে।

যদিও নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছেন বলেন্দ্র শাহ, কিন্তু তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়।

নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এখানে স্থায়ী সরকার গঠন করা সহজ নয়। পুরনো দলগুলোর অভিজ্ঞ নেতারা রাজনৈতিক কৌশলে বেশ দক্ষ। অতীতে বহুবার দেখা গেছে দল ভাঙা বা জোট পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তার পাশাপাশি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক সংস্কার—এই বড় সমস্যাগুলোর সমাধানও নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হবে।

নেপালের এই নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে এসেছে। তরুণ প্রজন্ম যদি সংগঠিত হয়, তাহলে তারা রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে—এই নির্বাচন তার বড় উদাহরণ।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে নেপালের সাম্প্রতিক নির্বাচন দেশটির রাজনীতিতে এক বড় মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। জেন জ়ি প্রজন্মের শক্তি এবং নতুন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা মিলিয়ে এবার ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন বলেন্দ্র শাহ।

তবে সত্যিকারের পরীক্ষা এখন শুরু। নির্বাচনের জয়কে বাস্তব উন্নয়নে রূপ দিতে পারলেই এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে। আর যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে নেপালের রাজনীতি দীর্ঘদিন পর একটি স্থিতিশীল ও নতুন দিক পেতে পারে।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন