Homeবিশেষ প্রতিবেদননুরুজ্জামান লাল্টুর জীবনকাহিনী: মুক্তিযোদ্ধা থেকে চরমপন্থী, তারপর আত্মসমর্পণ!

নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবনকাহিনী: মুক্তিযোদ্ধা থেকে চরমপন্থী, তারপর আত্মসমর্পণ!

Share

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের সন্তান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান লাল্টুর ইন্তেকাল ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর ঘটনাবহুল জীবন। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অধ্যায় থেকে শুরু করে চরমপন্থী কর্মকাণ্ড, আত্মগোপন, গ্রেপ্তার, আত্মসমর্পণ এবং দীর্ঘ কারাজীবন—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল বৈপরীত্য ও বিতর্কে ঘেরা এক জটিল কাহিনি।

এই প্রবন্ধে আমরা তুলে ধরছি নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, তাঁর আত্মসমর্পণ, কারাজীবন, উন্নয়ন দাবি এবং সাংবাদিকতার এক স্মরণীয় দিনের অভিজ্ঞতা।

নুরুজ্জামান লাল্টু ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি দেশের জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। তাঁর পরিবারও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, যা তাঁকে এক বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর তিনি ভিন্ন পথে হাঁটেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলেও, লাল্টু সশস্ত্র চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তিনি একসময় চরমপন্থী সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন। তাঁর নাম দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন তিনি আত্মগোপনে থাকেন এবং একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত হন।

চরমপন্থী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ার পর নুরুজ্জামান লাল্টু দীর্ঘ সময় পলাতক জীবন কাটান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁকে ধরতে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে। শেষ পর্যন্ত তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করেন।

১৯ বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি মুক্তি লাভ করেন। এই দীর্ঘ কারাজীবন তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।

নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই। সেদিন তিনি নিজ গ্রাম কয়রাডাঙ্গায় সহকর্মীদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ও কয়েকশ রাউন্ড গুলিসহ এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক আলোচিত ঘটনা হয়ে থাকে।

সেদিনের দৃশ্য ছিল অভাবনীয়। লম্বা পাটিতে বসে ছিলেন নুরুজ্জামান লাল্টু, তাঁর ভাইপো বিপ্লব, দীপুসহ শতাধিক চরমপন্থী সদস্য। সামনে সাজানো ছিল বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি লুৎফুল কবীরসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

এই আত্মসমর্পণ কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া ছিল না; এটি ছিল একটি রাজনৈতিক বার্তা—সহিংসতা থেকে ফিরে আসার ঘোষণা।

আত্মসমর্পণের সময় নুরুজ্জামান লাল্টু সরকারের কাছে লিখিতভাবে প্রায় ১৬টি দাবি পেশ করেন। এসব দাবি মূলত উন্নয়নমূলক ছিল। তাঁর দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:

কয়রাডাঙ্গা গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন

টেলিফোন লাইন চালু করা

কাঁচা রাস্তা পাকা করা

অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা

গ্রামবাসীরা লিফলেট আকারে এসব দাবি সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেন। এতে স্পষ্ট হয়, তাঁর আত্মসমর্পণ শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য নয়; বরং গ্রাম উন্নয়নের বিষয়টিও সামনে আনতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন—সহিংসতার মাধ্যমে দাবি আদায় কি ন্যায্য?

কয়রাডাঙ্গা যাওয়ার পথে ভালাইপুর মোড়ে একটি ইটভাটা ছিল, যা স্থানীয়দের মতে একসময় নৃশংস ঘটনার সাক্ষী ছিল। বর্ষা মৌসুমে বন্ধ থাকা সেই ভাটাকে ঘিরে নানা গল্প প্রচলিত ছিল। অভিযোগ ছিল, সেখানে বহু মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে লাল্টুর নির্দেশে।

এই অভিযোগ তাঁর জীবনের অন্ধকার অধ্যায়কে আরও গভীর করে তোলে। যদিও এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার বা প্রামাণ্য দলিল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবু স্থানীয় জনমনে এই স্মৃতি আজও জীবন্ত।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা সাংবাদিকদের জন্য দিনটি ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। যশোর থেকে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ হয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌঁছানো, সেখান থেকে যানবাহনের অভাবে বেশি ভাড়ায় থ্রি-হুইলার ভাড়া করা—সব মিলিয়ে ছিল কঠিন যাত্রা।

কয়রাডাঙ্গা গ্রামে প্রবেশের পথও প্রথমে বন্ধ ছিল। পুলিশের সহযোগিতায় অবশেষে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানো যায়। পুরো ঘটনা কভার করেন দৈনিক জনকণ্ঠ খুলনা অফিসের ফটোগ্রাফার ফাইয়াজ হোসেন পলাশ।

ফেরার পথেও ছিল বিড়ম্বনা। রাত হয়ে যাওয়ায় খুলনায় ছবি প্রিন্ট করার প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত যশোর শহরের জেস টাওয়ারে অবস্থিত ‘ওশিন কালার ল্যাব’-এ ছবি প্রিন্ট করা হয়। সেখান থেকে খুলনায় ছবি পাঠানো হয় এবং যশোর থেকে সংবাদ প্রেরণ করা হয়।

পরদিন দৈনিক জনকণ্ঠের প্রথম পাতায় চার কলামে সংবাদটি প্রকাশিত হয়, যা ঘটনাটিকে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় নিয়ে আসে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একজন মুক্তিযোদ্ধা কেন সশস্ত্র চরমপন্থার পথে হাঁটলেন? এটি শুধু নুরুজ্জামান লাল্টুর ব্যক্তিগত গল্প নয়; এটি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি।

অনেকে মনে করেন, যুদ্ধ-পরবর্তী হতাশা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব অনেককে বিপথে ঠেলে দেয়। আবার কেউ কেউ ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রভাব বিস্তারের মানসিকতাকে দায়ী করেন। সত্য যাই হোক, লাল্টুর জীবন আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে—আদর্শ থেকে বিচ্যুতি কখনো কখনো ইতিহাসকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়।

নুরুজ্জামান লাল্টুর ইন্তেকালের পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আবারও আলোচনায় এসেছে তাঁর নাম। কেউ তাঁকে স্মরণ করছেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, কেউ বা চরমপন্থী নেতা হিসেবে। তাঁর জীবন একই সঙ্গে গৌরব ও বিতর্কের প্রতীক।

একজন মানুষের জীবনে এত বৈপরীত্য বিরল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সশস্ত্র চরমপন্থা, তারপর আত্মসমর্পণ ও দীর্ঘ কারাজীবন—এই ঘটনাপ্রবাহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক শিক্ষণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবন এক জটিল ইতিহাস। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, আবার ছিলেন বিতর্কিত চরমপন্থী নেতা। তিনি আত্মসমর্পণ করেছেন, কারাজীবন কাটিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত নীরব প্রস্থান করেছেন।

তাঁর জীবনের অজানা গল্প, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ একদিন হয়তো আরও বিশদভাবে লেখা হবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসে নুরুজ্জামান লাল্টুর নাম এক আলোচিত ও বহুমাত্রিক অধ্যায় হিসেবে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: সাজেদ বকুল, সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন