চকোলেট এমন এক মিষ্টি খাবার, যা ছোট-বড় সবার মন মুহূর্তে ভালো করে দেয়। মন খারাপ হোক বা খুশির দিন, এক টুকরো চকোলেট অনেক সময় সবকিছু ঠিক করে দেয়। সারা বিশ্বের মতো ভারতেও চকোলেটের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া।
কিন্তু আপনি কি জানেন, ভারতের মধ্যেই আছে একটি শহর, যাকে মানুষ এখন “চকোলেট শহর” নামে ডাকতে শুরু করেছে? সেই শহরের নাম উটি। তামিলনাড়ুর পাহাড়ঘেরা এই সুন্দর শহরে বেড়াতে গেলে প্রায় সবাই কমপক্ষে এক বাক্স চকোলেট সঙ্গে করে নিয়ে ফেরেন।
চকোলেট শুধু একটি খাবার নয়, অনেকের কাছে এটি আবেগ। মুখে দিলেই যেন মনটা একটু নরম হয়ে যায়। ইউরোপের দেশগুলো যেমন সুইৎজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, জার্মানি বা ইতালি বিশ্বজুড়ে তাদের চকোলেটের জন্য বিখ্যাত। সেখানে নানা স্বাদের, নানা গন্ধের চকোলেট তৈরি হয়। স্বাদে আর মানে সেই চকোলেটের তুলনা নেই।
ভারত চকোলেট উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে না পড়লেও, ভারতীয়দের চকোলেটপ্রেম কোনো অংশে কম নয়। আর এই ভালোবাসার ফলেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে ভারতের নিজস্ব চকোলেট শহর উটি।
উটি একটি পাহাড়ি শহর। এখানে সারা বছরই ঠান্ডা ও মনোরম আবহাওয়া থাকে। খুব বেশি গরম পড়ে না, আবার অসহ্য ঠান্ডাও নয়। এই ধরনের আবহাওয়া চকোলেট তৈরির জন্য ভীষণ উপযোগী। চকোলেট গলানো, ঠান্ডা করা বা সেট করা—সবকিছুর জন্যই স্থির তাপমাত্রা দরকার হয়।
এছাড়াও উটির আশপাশে দুধ, কোকো, মাখনের মতো কাঁচামাল তুলনামূলক সহজে পাওয়া যায়। তাই অনেক বছর আগেই এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়িতে বাড়িতে নিজের মতো করে চকোলেট বানানো শুরু করেন।
শুরুর দিকে উটিতে চকোলেট তৈরি হতো খুব অল্প পরিমাণে। এটি ছিল অনেকটা ঘরোয়া কুটিরশিল্পের মতো। পরিবারের লোকজন নিজেরা খাওয়ার জন্য বা পরিচিতদের দেওয়ার জন্য চকোলেট বানাতেন। তখন কেউ ভাবেননি, এই ছোট উদ্যোগ একদিন শহরের পরিচয় বদলে দেবে।
ধীরে ধীরে উটিতে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা এই ঘরে তৈরি চকোলেটের স্বাদ পেতে শুরু করেন। অনেকেই বলতেন, এই চকোলেটের স্বাদ আলাদা। খুব মোলায়েম, বেশি মিষ্টি নয়, আবার কৃত্রিম গন্ধও নেই। পর্যটকদের মুখে মুখে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি।
উটি এমনিতেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। নীলগিরি পাহাড়, চা বাগান, লেক আর সবুজে ঘেরা এই শহরে সারা বছরই পর্যটকের ভিড় লেগে থাকে। যখন পর্যটকেরা স্থানীয় চকোলেটের প্রশংসা করতে শুরু করলেন, তখন ব্যবসায়িকভাবে বিষয়টি নিয়ে ভাবনা শুরু হয়।
ক্রমে উটিতে চকোলেট উৎপাদন বাড়তে থাকে। ছোট ছোট কারখানা গড়ে ওঠে। এখন উটির আশপাশে হাঁটলেই চোখে পড়বে অসংখ্য চকোলেটের দোকান। রাস্তায় দাঁড়িয়েই নানা স্বাদের চকোলেট সাজানো থাকে। দুধ চকোলেট, ডার্ক চকোলেট, নাটস মেশানো চকোলেট, কিশমিশ বা কফি ফ্লেভারের চকোলেট—পছন্দের শেষ নেই।
উটির চকোলেটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বাভাবিক স্বাদ। এখানে অতিরিক্ত কেমিক্যাল বা সংরক্ষণকারী ব্যবহার করা হয় না। অনেক চকোলেট এখনো হাতে বানানো হয়। তাই স্বাদে থাকে ঘরোয়া ভাব।
আরেকটি বিষয় হলো তাজা ভাব। উটিতে তৈরি চকোলেট অনেক সময় সেদিনই দোকানে ওঠে। ফলে স্বাদ থাকে আরও ভালো। যারা একবার এই চকোলেট খেয়েছেন, তারা অনেকেই বলেন, বড় ব্র্যান্ডের চকোলেটের থেকেও উটির চকোলেট আলাদা আনন্দ দেয়।
উটিতে বেড়াতে গেলে মানুষ সাধারণত পরিবার বা বন্ধুদের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে যেতে চান। তখন চকোলেটই হয়ে ওঠে সেরা পছন্দ। দাম তুলনামূলক কম, বহন করা সহজ, আর সবাই খুশি হয়।
অনেক পর্যটক তো এক বাক্স নয়, একাধিক বাক্স কিনে নেন। কেউ অফিসের জন্য, কেউ আত্মীয়দের জন্য, কেউ নিজের জন্য। এভাবেই উটির চকোলেট ধীরে ধীরে রাজ্যের বাইরে, এমনকি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচিত হয়ে ওঠে।
এই ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণেই উটির নামের সঙ্গে জুড়ে গেছে নতুন পরিচয়—“ভারতের চকোলেট শহর”। আজ উটি মানেই শুধু পাহাড় বা চা বাগান নয়, উটি মানেই সুস্বাদু ঘরোয়া চকোলেট।
যারা উটিতে যাননি, তারা অনেকেই এখন এই শহরের চকোলেটের গল্প শুনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। আর যারা একবার গেছেন, তারা জানেন, উটি থেকে খালি হাতে ফেরা প্রায় অসম্ভব।
উটিতে বেড়ানো মানে শুধু চোখ ভরে প্রকৃতি দেখা নয়, রসনাতৃপ্তিও। পাহাড়ি হাওয়া, কুয়াশায় মোড়া সকাল আর হাতে এক টুকরো উটির চকোলেট—এই অভিজ্ঞতা সহজে ভোলার নয়।
তাই পরের বার যদি পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, উটিকে তালিকায় রাখতেই পারেন। আর মনে রাখবেন, ফিরে আসার সময় ব্যাগে যেন অন্তত এক বাক্স উটির চকোলেট থাকেই। কারণ উটি থেকে এই মিষ্টি স্মৃতি না নিয়ে ফিরলে ভ্রমণটা যে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

