অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার কূটনৈতিক পাসপোর্ট, যাকে আমরা সাধারণভাবে লাল পাসপোর্ট বলি, আগেভাগেই জমা দেওয়ার খবর সামনে আসার পর থেকেই দেশজুড়ে আলোচনা থামছেই না। বিষয়টি শুনতে সাধারণ মনে হলেও বাস্তবে এটি রাজনীতি, প্রশাসন আর ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এমন সিদ্ধান্ত কেন, আর ঠিক এই সময়েই বা কেন?
সম্প্রতি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এক বক্তব্যে জানান, উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, কেউ কেউ আগেভাগেই সাধারণ পাসপোর্ট নিতে চেয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে ভিসা নেওয়া সহজ হয় এবং সময়ের ঝামেলা না থাকে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেননি, ঠিক কতজন বা কারা এই পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। নিজের বিষয়ে তিনি পরিষ্কার করে জানান, তিনি কিংবা তাঁর স্ত্রী এখনো কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেননি। বরং দায়িত্ব চলমান থাকা অবস্থায় এমন সিদ্ধান্তকে তিনি “খুব অস্বাভাবিক” বলেই মন্তব্য করেন।
এদিকে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, তিনি তাঁর কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য বেশ সরল। তিনি বলেন, তাঁর আর বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই, জরুরি বৈঠক ছাড়া তিনি সাধারণত বিদেশেও যান না। তাই আগেই পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন।
এছাড়া উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও নিজের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এসব তথ্য সামনে আসতেই বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল আরও বেড়ে যায়।
আইনগতভাবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়া নিষিদ্ধ নয়। কেউ চাইলে আগেভাগেই সাধারণ পাসপোর্ট নিতে পারেন। তাহলে প্রশ্ন উঠছে কেন?
এখানেই আসে সময়ের বিষয়টি। দেশ এখন নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তন হয়েছে। প্রায় দুই বছর পর এমন এক সময়ে কয়েকজন উপদেষ্টার এই সিদ্ধান্ত অনেকের মনে সন্দেহ তৈরি করছে।
অনেকে ভাবছেন, এটি কি শুধুই প্রশাসনিক প্রস্তুতি, নাকি ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে ভেতরের কোনো আশঙ্কার প্রতিফলন?
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদের মতে, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে খুবই বিরল। তিনি বলেন, আইনের চোখে এতে সমস্যা নেই। কিন্তু বাস্তব দিক থেকে দেখলে এটি অস্বাভাবিক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদও মনে করেন, সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সময়টাই প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তাঁর মতে, নির্বাচনোত্তর পরিবেশের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তকে মিলিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে যখন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার ঘোষণা দিলেও সেটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, তখন সন্দেহ আরও বাড়ে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে উপদেষ্টাদের মধ্যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ভাবনাও কাজ করতে পারে। ক্ষমতা বদলের পর নতুন সরকার কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।
এই অনিশ্চয়তা থেকেই কেউ কেউ আগেভাগেই সাধারণ পাসপোর্টের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যেন দায়িত্ব ছাড়ার পর বিদেশে যেতে হলে আর বাড়তি ঝামেলায় পড়তে না হয়।
মুন্সি ফয়েজ আহমেদের ভাষায়, আগেভাগে করলে প্রক্রিয়াটা সহজ হয়। দায়িত্ব শেষ হলে নতুন নিয়ম বা বাধা আসতে পারে, এই চিন্তা থেকেই অনেকে নিরাপদ পথ বেছে নিচ্ছেন।
কূটনৈতিক পাসপোর্ট না থাকলে দায়িত্ব পালনেও কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক সফরে ভিসা, কাস্টমস চেক, কূটনৈতিক সুবিধা—এসব ক্ষেত্রে সাধারণ পাসপোর্টধারীদের বাড়তি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এই কারণেই অতীতে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কেউ সাধারণত কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছাড়তেন না। এখানেই বর্তমান পরিস্থিতি ব্যতিক্রম হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে পাসপোর্ট ব্যবস্থার মূল ভিত্তি বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩ এবং পাসপোর্ট বিধিমালা, ১৯৭৪। এই আইনের আওতায় ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর ই-পাসপোর্ট ইস্যু করে, যা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন।
বাংলাদেশ সরকার মূলত তিন ধরনের পাসপোর্ট দেয়। সাধারণ মানুষের জন্য সবুজ পাসপোর্ট, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নীল পাসপোর্ট এবং কূটনৈতিকদের জন্য লাল পাসপোর্ট।
কূটনৈতিক পাসপোর্ট সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সচিব এবং বিদেশে কর্মরত কূটনীতিকদের দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক কাজে যুক্ত ব্যক্তিরাও এই পাসপোর্ট পেতে পারেন।
এই পাসপোর্টের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আন্তর্জাতিক ভ্রমণে সহজতা। অনেক দেশে ভিসা ছাড়াই যাতায়াত করা যায়। কাস্টমস চেকে সময় কম লাগে। কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দায়মুক্তির সুবিধাও পাওয়া যায়।
মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকলে হঠাৎ করেই অনেক দেশে যাওয়া সম্ভব। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন, সব সুবিধা সব দেশে এক রকম নয়। যে দেশে কূটনীতিক দায়িত্বরত, সেখানে সুবিধা বেশি থাকে। অন্য দেশে সব সুবিধা পাওয়া নাও যেতে পারে।
সব কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী সরাসরি কূটনৈতিক দায়িত্বে থাকেন না। মন্ত্রী, এমপি বা সচিবরা অনেক সময় স্পেশাল ক্যাটাগরিতে এই পাসপোর্ট পান। তারা কূটনীতিক নন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় মর্যাদার কারণে এই সুবিধা দেওয়া হয়।
বিদেশ সফরের সময় সাধারণত সরকার একটি লেটার অব ইন্ট্রোডাকশন দেয়, যা সরকারি আদেশ হিসেবে কাজ করে। তবে দায়িত্বরত কূটনীতিকদের ক্ষেত্রে অনেক সময় আলাদা জিও লাগে না।
সব মিলিয়ে উপদেষ্টাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়া আইনগতভাবে বৈধ হলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এটি স্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে নির্বাচন সামনে রেখে এমন সিদ্ধান্ত মানুষের মনে প্রশ্ন তুলছে।
এটি কি নিছক প্রশাসনিক সুবিধার জন্য, নাকি ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার প্রস্তুতি? এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে একথা নিশ্চিত, লাল পাসপোর্ট জমা দেওয়ার এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

