বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কেবল একটি খেলায় সীমাবদ্ধ নয়। ফুটবল, হকি, হ্যান্ডবল থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ, রেফারিং ও সংগঠক হিসেবে তাঁদের অবদান দীর্ঘদিন ধরে ক্রীড়াক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। মোঃ জমির হোসেন লাবু জোয়ার্দার ঠিক তেমনই এক বহুমাত্রিক ক্রীড়াবিদ, যাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় জুড়ে আছে নিষ্ঠা, সংগ্রাম আর সাফল্যের গল্প।
মোঃ জমির হোসেন লাবু জোয়ার্দারের জন্ম ১৯৭২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি। জন্মস্থান যশোর শহরের খড়কি কাসারদীঘি এলাকা, মাতুলালয়েই তাঁর শৈশবের শুরু। পিতা আবুল হোসেন জোয়ার্দার। পারিবারিক ঠিকানা যশোর শহরের ২১০ নম্বর সার্কিট হাউজ রোড। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ।
খেলাধুলার পরিবেশ তিনি পেয়েছিলেন পরিবার থেকেই। তাঁর তিন ভাইই ছিলেন ঢাকা প্রথম বিভাগ হকি লীগের খেলোয়াড়। বড় ভাই সাবু জোয়ার্দার ঢাকা ওয়ারী ক্লাবের স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেছেন, আর লাবু জোয়ার্দার নিজে ফরাশগঞ্জ ক্লাবের ডিফেন্সে খেলেছেন। এই পারিবারিক ক্রীড়া ঐতিহ্যই তাঁকে মাঠের প্রতি গভীরভাবে টেনে আনে।
লাবু জোয়ার্দার তাঁর উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন যশোর এম এম কলেজ থেকে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান আকর্ষণ। ফুটবলে তাঁর হাতে খড়ি হয় ইমদাদুল হক সাচ্চুর কাছে। এই সময়েই তিনি বুঝতে পারেন, খেলাধুলা তাঁর জীবনের মূল পথ।
১৯৮৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এরশাদ কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের সূচনা। এই টুর্নামেন্টে তিনি অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন, যা তাঁর নেতৃত্বগুণের প্রথম বড় প্রমাণ। ১৯৮৪-৮৫ মৌসুমে এরশাদ টুর্নামেন্টের জাতীয় ক্যাম্পে ডাক পান এবং এক মাস ক্যাম্পে অংশ নেন।
১৯৯২-১৯৯৩ সালে তিনি যশোর জেলা ফুটবল দলে অন্তর্ভুক্ত হন। খেলোয়াড় জীবনে যশোর লীগের একাধিক ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের হয়ে মাঠে নামেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য টাউন ক্লাব, অগ্রদূত ক্লাব, অগ্রণী ক্লাব, অদিতি ক্রীড়া চক্র, সৌখিন ক্রীড়া চক্র, পৌরসভা ক্লাব, মিতালী সংঘ এবং রেলগেট যুব সংঘ। প্রতিটি ক্লাবেই তিনি নিজের দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে আলাদা পরিচয় গড়ে তোলেন।
ফুটবলের পাশাপাশি হকিতে তাঁর অবদান ছিল আরও বিস্তৃত। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি যশোর জেলা যুব দলে হকিতে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে অধিনায়ক হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দেন এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। ১৯৮৭ সাল থেকে নিয়মিত জেলা দলের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং ১৯৯৭ সালে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা প্রথম বিভাগ হকি লীগেও তাঁর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৯৮৯-১৯৯০ মৌসুমে ঢাকা ওয়ারী ক্লাব, ১৯৯১-১৯৯৩ সালে এজাক্স ক্লাব, ১৯৯৪-১৯৯৫ সালে আবাহনী লিমিটেডের হয়ে খেলেন। অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় হকি ক্যাম্পেও ডাক পান, যা তাঁর প্রতিভার জাতীয় স্বীকৃতি।
১৯৯৫-১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলার পাশাপাশি ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সোনালী ব্যাংকের হয়ে অফিস লীগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। সেই বছরই প্রথম বিভাগে রানার্স আপ হয়ে দলকে প্রিমিয়ার লীগে উন্নীত করেন। ২০০০ সালে ঢাকা ওয়াণ্ডারার্স ক্লাবের হয়ে খেলেন এবং পরে বাংলাদেশ স্পোর্টিং ক্লাব, মুক্ত বিহঙ্গ ক্লাব ও সাধারণ বীমার হয়ে ২০০৫ সাল পর্যন্ত হকি খেলেই মাঠের খেলোয়াড় জীবনকে বিদায় জানান।
ঢাকার বাইরে রাজশাহী প্রথম বিভাগ হকি লীগে ফ্রেন্ডস ক্লাবের হয়ে নিয়মিত খেলেছেন এবং ফরিদপুর হকি লীগেও অংশগ্রহণ করেছেন। মাহমুদ রিবন, রিন্টু, আলমগীর সিদ্দিকী, লিটু ও নান্নুর মতো খেলোয়াড়দের কাছ থেকে তিনি অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা এসেছিল তাঁর মায়ের কাছ থেকে এবং বড় ভাই রিন্টুর হাত ধরে ঢাকায় হকির মাঠে তাঁর প্রতিষ্ঠা।
১৯৮৬-১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত যশোর জেলা হ্যান্ডবল দলে নিয়মিত খেলোয়াড় হিসেবে অংশ নেন লাবু জোয়ার্দার। পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন লীগেও হ্যান্ডবল খেলেছেন। এর আগে ১৯৮৩ সালে এনএসসি শিবিরে এক মাসের জাতীয় ফুটবল প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, যা তাঁর ক্রীড়া জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করে।
খেলোয়াড় জীবনের পাশাপাশি তিনি প্রশিক্ষণ ও স্কাউটিংয়েও নিজেকে যুক্ত রাখেন। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ খো খো ফেডারেশন আয়োজিত প্রথম খো খো কোচ কোর্স প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশগ্রহণ করে সার্টিফিকেট অর্জন করেন।
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন, যা তাঁর শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি। তিনি দুটি স্কাউট জাম্বুরি এবং একটি রোভার স্কাউট জাম্বুরিতে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৯৯ সালে ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে পল্লী বিদ্যুৎ দলের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর ৩ এস টি ইউনিটে ফুটবল প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তিনি তরুণ খেলোয়াড়দের গড়ে তোলার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
খেলোয়াড় জীবন শেষ হলেও মাঠ থেকে তিনি দূরে যাননি। বর্তমানে তিনি যশোর ফুটবল রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের একজন সক্রিয় ফুটবল রেফারি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট স্কোরার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি রেফারি ও আম্পেয়ারিং কার্যক্রমে নিয়মিত যুক্ত আছেন।
মোঃ জমির হোসেন লাবু জোয়ার্দারের জীবন কেবল একজন খেলোয়াড়ের গল্প নয়। এটি একজন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষের আজীবন সাধনার প্রতিচ্ছবি। মাঠে খেলোয়াড়, মাঠের বাইরে প্রশিক্ষক, সংগঠক ও রেফারি হিসেবে তাঁর অবদান যশোর তথা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে একটি অনুপ্রেরণার নাম। নিষ্ঠা, পরিশ্রম আর ভালোবাসা থাকলে যে একজন মানুষ কতটা বহুদূর যেতে পারেন, লাবু জোয়ার্দারের জীবন তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।
লেখক: সাজেদ বকুল, সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

