হলভর্তি দর্শক, ঝলমলে আলো, মঞ্চে শিল্পীর পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে যেখানে আনন্দ আর উদযাপনের কথা, সেখানেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মৌনী রায়। হরিয়ানার কর্নলে একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রকাশ্যে শারীরিক ও মানসিক হেনস্থার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন তিনি। নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার কথা প্রকাশ্যে এনে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছেন অভিনেত্রী।
এই ঘটনা শুধু একজন তারকার অভিজ্ঞতা নয়। এটা আসলে সমাজের সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতা, যেখানে একজন সফল, পরিচিত নারীও নিরাপদ নন। মৌনীর বক্তব্য সামনে আসতেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রকাশ্যে নারীদের নিরাপত্তা, অনুষ্ঠানস্থলে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং মানসিকতার গভীর সংকট।
হরিয়ানার কর্নলে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন মৌনী রায়। অনুষ্ঠান শুরুর আগেই এমন কিছু ঘটবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি। অভিনেত্রীর অভিযোগ, দর্শকদের মধ্যেই এমন দু’জন ব্যক্তি ছিলেন, যাঁদের বয়স তাঁর ভাষায় ‘কাকু কিংবা দাদু হওয়ার মতো’। সেই দুই প্রৌঢ় তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার অজুহাতে অশোভন আচরণ শুরু করেন।
মৌনীর কথায়, ওই ব্যক্তিরা তাঁর কোমরে হাত রেখে ছবি তুলতে চান। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে অস্বস্তিকর মনে হয় অভিনেত্রীর। তিনি স্পষ্টভাবে তাঁদের বলেন, দয়া করে হাত সরাতে। একজন নারী হিসেবে নিজের সীমা টেনে দেওয়ার এই স্বাভাবিক অনুরোধই যেন তাঁদের কাছে অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়।
এই ঘটনাটি ঘটে মঞ্চে ওঠার আগেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখানেই শেষ হয়নি সব কিছু।
অনুষ্ঠান শুরু হলে মৌনী মঞ্চে পারফর্ম করতে যান। দর্শকদের একেবারে সামনের সারিতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই দুই প্রৌঢ়। অভিযোগ, মঞ্চে থাকা অবস্থায় তাঁরা লাগাতার অশালীন মন্তব্য এবং অশোভন অঙ্গভঙ্গি করতে থাকেন। একজন শিল্পীর জন্য মঞ্চ মানে কাজের জায়গা। সেখানে এমন আচরণ মানসিকভাবে কতটা ভেঙে দিতে পারে, তা সহজেই বোঝা যায়।
মৌনী প্রথমে ভদ্রভাবেই তাঁদের এই আচরণ বন্ধ করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে। ওই ব্যক্তিরা নাকি তখন মঞ্চের দিকে গোলাপ ফুল ছুড়তে শুরু করেন। বাইরে থেকে দেখলে বিষয়টি হয়তো নিরীহ মনে হতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি এবং আগের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে এটি ছিল চরম অসম্মানজনক ও ভয় ধরানো।
এই সব ঘটনার জেরে মৌনী এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যে, একসময় তাঁর মনে হয়েছিল মঞ্চ ছেড়ে চলে যাবেন। একজন পেশাদার শিল্পী হিসেবে তিনি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ করেন। কিন্তু অনুষ্ঠানের সময় ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া তাঁকে আরও বেশি হতবাক করে দেয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে আয়োজকদের ভূমিকা নিয়ে। মৌনীর অভিযোগ, দর্শকদের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা ওই দুই ব্যক্তিকে সরানোর জন্য কেউ কোনও উদ্যোগ নেননি। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কেউ এগিয়ে আসেননি। এমনকি আয়োজকরাও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেননি।
একজন শিল্পী যখন প্রকাশ্যে হেনস্থার শিকার হন, তখন কর্তৃপক্ষের এই নীরবতা আরও ভয়ঙ্কর বার্তা দেয়।
এই ঘটনার পর মৌনী রায় সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘ একটি পোস্টে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর লেখায় স্পষ্ট ক্ষোভ, অপমান এবং ভয়। তিনি জানান, একজন পরিচিত অভিনেত্রী হয়েও যদি তাঁকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে নতুন বা অচেনা মেয়েদের কী অবস্থা হয়, তা ভাবতেই শিউরে উঠতে হয়।
মৌনীর কথায়, তিনি নিজেকে অপমানিত এবং আতঙ্কিত বোধ করেছেন। এই অভব্য আচরণ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটা সমাজের মানসিকতার প্রতিফলন। তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন, এমন ঘটনার বিরুদ্ধে কেন কোনও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও সামনে এসেছে নারীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন। অনুষ্ঠানস্থল হোক বা কর্মক্ষেত্র, প্রকাশ্য জায়গায় হোক বা ব্যক্তিগত পরিসর—সব জায়গাতেই নারীরা এখনও হেনস্থার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
মৌনী রায় স্পষ্টভাবে বলেছেন, তাঁরা শিল্পী। শিল্পের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। কাজ করতে গিয়ে যদি নিরাপত্তার অভাব থাকে, তাহলে সেটি শুধু শিল্পীর নয়, গোটা সমাজের ব্যর্থতা।
তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। যদি ওই ব্যক্তিদের মেয়েদের সঙ্গে কেউ এমন আচরণ করত, তাহলে তাঁদের প্রতিক্রিয়া কী হতো? এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমাজের দ্বিচারিতা।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছেন অনুষ্ঠানটির আয়োজকরা। কোনও অনুষ্ঠানে শিল্পীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাঁদের মৌলিক দায়িত্ব। দর্শকদের মধ্যে কেউ যদি সীমা লঙ্ঘন করেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু এখানে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। মৌনীর অভিযোগ অনুযায়ী, আয়োজকরা নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন। এই দায়িত্বহীনতা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদের পথ খুলে দিতে পারে।
মৌনীর অভিজ্ঞতা নতুন নয়। প্রতিদিন অসংখ্য নারী প্রকাশ্যে এমন হেনস্থার শিকার হন, যাঁদের কণ্ঠস্বর কখনও শোনা যায়, কখনও যায় না। একজন তারকা মুখ খুললে বিষয়টি আলোচনায় আসে। কিন্তু সমস্যার মূল জায়গায় হাত না দিলে এই ঘটনাগুলি থামবে না।
নারীর শরীর বা ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করা শেখাতে হবে ছোটবেলা থেকেই। বয়স, পরিচয় বা ক্ষমতার দোহাই দিয়ে কেউ কারও গায়ে হাত দিতে পারে না—এই বোধ সমাজে গেঁথে দিতে হবে।
হরিয়ানার কর্নলের এই ঘটনা শুধুমাত্র মৌনী রায়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। প্রকাশ্যে নারীদের নিরাপত্তা এখনও কতটা নড়বড়ে, তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই ঘটনা।
মৌনীর সাহসিকতার জন্য তাঁকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। তিনি চুপ করে না থেকে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। এতে হয়তো আরও অনেক নারী নিজেদের কথা বলার সাহস পাবেন।
সমাজ, আয়োজক, প্রশাসন—সবাইকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে। নইলে মঞ্চ, রাস্তা বা কর্মক্ষেত্র—কোনও জায়গাই নারীদের জন্য সত্যিকারের নিরাপদ হয়ে উঠবে না।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

