ডিজিটাল দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জীবন সহজ করেছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তিই যখন মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা আর গোপনীয়তাকে আঘাত করে, তখন প্রশ্ন উঠবেই।
ঠিক এমনই এক ভয়ংকর বিতর্কে আবারও জড়াল এলন মাস্কের সংস্থা এক্স-এর এআই ফিচার ‘গ্রক’। অভিযোগ, এই এআই ব্যবহার করে শিশু ও নারীদের লক্ষ লক্ষ অশ্লীল, বিকিনি পরিহিত ছবি তৈরি করা হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, যাঁদের ছবি বানানো হয়েছে, তাঁদের অনেকেই জানতেনই না।
এই ঘটনা শুধু প্রযুক্তির অপব্যবহারের গল্প নয়। এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা, নারীর সম্মান এবং শিশু সুরক্ষার বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
গ্রক মূলত একটি এআই টুল। এর কাজ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, ছবি তৈরি করা এবং ব্যবহারকারীর নির্দেশ অনুযায়ী কনটেন্ট বানানো। শুরুতে এটি সাধারণ একটি চ্যাটবট হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে ব্যবহারকারীরা এর ছবি তৈরির ক্ষমতাকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেন।
অভিযোগ উঠেছে, গ্রকের কাছে নারীদের স্বচ্ছ বিকিনি বা খোলামেলা পোশাকে ছবি বানানোর অনুরোধ জানালেই, এআই তা তৈরি করে দিত। শুধু কল্পনার মানুষ নয়, বাস্তব মানুষের মুখও ব্যবহার করা হতো। একজনের মুখ বসানো হতো অন্যের অর্ধনগ্ন শরীরে। পুরো কাজটি হতো কয়েক সেকেন্ডে।
সবচেয়ে আতঙ্কের জায়গাটা এখানেই। অনেক ক্ষেত্রেই যাঁদের মুখ ব্যবহার করা হয়েছে, তাঁদের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। সোশাল মিডিয়ার ছবি বা প্রকাশ্যে থাকা ছবি থেকেই মুখ তুলে এনে এআই বানিয়ে ফেলেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অশ্লীল অবয়ব।
ভাবুন তো, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন ইন্টারনেটে আপনার নামের সঙ্গে একটি বিকিনি পরিহিত ছবি ঘুরছে। অথচ আপনি কখনো এমন ছবি তুলেইনি। বাস্তবে বহু নারী ঠিক এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন।
সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট বা সিসিডিএইচ-এর একটি রিপোর্ট এই বিতর্কে আগুনে ঘি ঢালে। সংস্থাটি জানায়, গ্রক ফিচার চালু থাকার সময়ে প্রায় ৩০ লক্ষ বিকিনি পরিহিত ও অশ্লীল ছবি তৈরি হয়েছে।
এই সংখ্যার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরেকটি ভয়ংকর তথ্য। মাত্র দু’সপ্তাহে প্রায় ২৩ হাজার শিশুর ছবি এইভাবে তৈরি ও ছড়ানো হয়েছে। বাকি ছবিগুলোর বেশিরভাগই প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের।
এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই নেটদুনিয়ায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এআই দিয়ে বানানো এই ছবিগুলো শুধু তৈরি করেই থেমে থাকেনি অনেকে। সেগুলো ছড়িয়ে পড়েছে সোশাল মিডিয়ায়। এক্স, টেলিগ্রাম এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে বহু নারী নিজেদের নামে ভুয়ো অশ্লীল ছবি খুঁজে পেয়েছেন।
কেউ কেউ জানান, বন্ধু বা পরিচিতদের কাছ থেকে ছবি দেখে ফোন এসেছে। অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। কারও চাকরি, কারও সামাজিক সম্মান ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে এলন মাস্ক ও তাঁর সংস্থা এক্স। অভিযোগ উঠেছে, এআই ফিচার চালুর আগে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কীভাবে এই ধরনের অনুরোধ আটকানো যাবে, সেই নিয়ন্ত্রণ ছিল দুর্বল।
এমনকি সোশাল মিডিয়ায় এমন ছবিও ঘুরেছে, যেখানে এলন মাস্কের মুখ বসিয়ে বিকিনি পরানো ছবি বানানো হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ফিচারটি কতটা সহজে অপব্যবহার করা সম্ভব ছিল।
ঘটনাটি সামনে আসার পর একাধিক দেশের সরকার সরব হয়। শিশু সুরক্ষা আইন ও ডিজিটাল গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। দ্রুত গ্রক ফিচার বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
চাপে পড়ে শেষমেশ এক্স কর্তৃপক্ষ বিতর্কিত এই ফিচারটি নিষিদ্ধ করে। যদিও ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে।
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিকার নারীরা। অনেকেই এখন নিজেদের ছবি সোশাল মিডিয়ায় দিতে ভয় পাচ্ছেন। কেউ প্রোফাইল বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ আবার আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটছেন।
এটা শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়। এটি মানসিক স্বাস্থ্যের বড় আঘাত। বিশ্বাস ভেঙে যাওয়া, লজ্জা, ভয়—সব মিলিয়ে বহু নারী এখন আতঙ্কে রয়েছেন।
এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই তার নিয়ন্ত্রণ জরুরি। শুধু নতুন ফিচার আনলেই হবে না। ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা, সম্মান এবং আইন মেনে চলা নিশ্চিত করতেই হবে।
এআই যেন হাতিয়ার না হয়ে ওঠে হয়রানির, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
গ্রক বিতর্ক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তি নিরপেক্ষ নয়। কে কীভাবে ব্যবহার করছে, তার ওপরেই সব নির্ভর করে। কিন্তু বড় সংস্থাগুলোর দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ তাদের একটি ভুল সিদ্ধান্তে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন প্রভাবিত হয়।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতে এমন কাণ্ড আরও বাড়বে। আর তখন ক্ষতির পরিমাণ হবে আরও ভয়ংকর।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

