Homeইতিহাস-ঐতিহ্যযশোর রেল স্টেশনের বইয়ের দোকান: হারিয়ে যেতে বসা পাঠাভ্যাসের এক নীরব সাক্ষ্য

যশোর রেল স্টেশনের বইয়ের দোকান: হারিয়ে যেতে বসা পাঠাভ্যাসের এক নীরব সাক্ষ্য

আর সেই সঙ্গে আমাদের সমাজও ফিরে পাবে তার চিন্তার গভীরতা। কারণ বই শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম নয়, বই মানুষ গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

Share

যশোর রেল স্টেশন শুধু একটি যাতায়াতের কেন্দ্র নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। ১৮৮২ সালে যশোর রেল স্টেশন নির্মিত হয় এবং ১৯৫৫ সালে এটি জংশনে উন্নীত হয়। এই দীর্ঘ সময়ের ভেতর দিয়ে স্টেশনটি যেমন বহু পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে, তেমনি এর বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা একটি ছোট বইয়ের দোকানও নীরবে বহন করে চলেছে পাঠাভ্যাসের ইতিহাস।

এই দোকানটি কবে শুরু হয়েছিল, তার সঠিক কোনো নথি নেই। তবে এর পুরনো কাঠামো, ধুলো জমা তাক আর বিবর্ণ সাইনবোর্ড দেখলেই বোঝা যায়—এর বয়স কম নয়। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম, মালিকানা বদলেছে বহুবার। ঠিক কতজন এই দোকান চালিয়েছেন, তা হিসাব করা কঠিন। কিন্তু বইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে দোকানটি একসময় ছিল ভীষণ ব্যস্ত।

একসময় ট্রেন ধরার আগে যশোর রেল স্টেশনের এই ছোট্ট বইয়ের দোকানে মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। কেউ কিনত উপন্যাস, কেউ কবিতার বই, কেউ আবার খবরের কাগজ বা ম্যাগাজিন। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি ভুলে থাকতে কাগজের পাতায় বাঁধা গল্প ছিল সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী। ট্রেন ছাড়তে দেরি হলে সেটাও মনে হতো উপভোগ্য সময়, কারণ হাতে থাকত নতুন কেনা বই।

সেই সময় মোবাইল ফোন ছিল না, ছিল না ইন্টারনেটের অবিরাম স্ক্রল। মানুষ অপেক্ষার সময়টুকু কাজে লাগাত পড়াশোনায়। রেল স্টেশনের বেঞ্চে বসে বই পড়া ছিল খুব সাধারণ দৃশ্য। যশোর রেল স্টেশনের এই বইয়ের দোকান তখন ছিল জ্ঞানের ছোট্ট ভাণ্ডার।

আজ দৃশ্যটা একেবারেই আলাদা। বইয়ের দোকানে আর সেই ভিড় নেই। তাকগুলোতে অল্প কিছু বই পড়ে থাকে নিঃসঙ্গভাবে। তার পাশে জায়গা নিয়েছে ভাজা খাবার, বিস্কুট, পাউরুটি আর নানা নিত্যপণ্য। দোকানটি এখন অনেকটাই সাধারণ স্টেশনের দোকানে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান দোকান মালিকের কথায়, বই বিক্রি হয় না বললেই চলে। মানুষ এখন আর ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করার সময় বই কেনে না। চোখ থাকে মোবাইলের স্ক্রিনে, আঙুল ব্যস্ত সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রলে। সময় কাটে ঠিকই, কিন্তু সেই সময় থেকে কিছুই জমা থাকে না মনে।

ডিজিটাল যুগ আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে বই পড়ার অভ্যাস। আগে মানুষ বই পড়ত জ্ঞান অর্জনের জন্য, চিন্তা প্রসারিত করার জন্য। এখন তথ্য আসে দ্রুত, কিন্তু গভীরতা কমে যাচ্ছে।

যশোর রেল স্টেশনের বইয়ের দোকানটি যেন এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতীক। এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমরা কীভাবে বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি। বই না পড়ার ফলে মানুষ ধীরে ধীরে ভাবনার দিক থেকে ফাঁপা হয়ে পড়ছে। তথ্য জানা আর জ্ঞান অর্জনের মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য, তা আমরা ভুলে যাচ্ছি।

একটি সমাজের পাঠাভ্যাস তার মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থার প্রতিফলন। যেখানে বইয়ের দোকান সমৃদ্ধ, সেখানে চিন্তাশীল মানুষ তৈরি হয়। আর যেখানে বইয়ের দোকান টিকে থাকার লড়াই করে, সেখানে সমাজও ধীরে ধীরে সংকটে পড়ে।

যশোর রেল স্টেশনের এই ছোট দোকানটি শুধু একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়। এটি আমাদের সমাজের আয়না। এখানে বইয়ের বদলে যখন খাবার বেশি বিক্রি হয়, তখন বুঝতে হয়—আমাদের অগ্রাধিকার কোথায় গিয়ে ঠেকেছে।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার তরুণ প্রজন্মের চিন্তাভাবনার ওপর। আর সেই চিন্তাভাবনার ভিত্তি তৈরি হয় বই পড়ে। যে জাতি বই ছেড়ে দেয়, তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যেতে সময় লাগে না—এই কথাটি শুধু আবেগের নয়, বাস্তবতারও।

আজকের প্রজন্ম তথ্য জানে অনেক, কিন্তু গভীরভাবে বোঝে কম। কারণ তারা বই পড়ে না। ছোট গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ—এসব পড়লে মানুষের ভেতরে চিন্তার জগৎ তৈরি হয়। যশোর রেল স্টেশনের বইয়ের দোকানটি সেই হারিয়ে যাওয়া জগৎটির কথা মনে করিয়ে দেয়।

এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। চাইলে আমরা আবার বইয়ের দিকে ফিরতে পারি। ট্রেনে যাত্রার সময় মোবাইলের বদলে যদি হাতে একটি বই নিই, তাহলে সময়ও কাটবে সুন্দরভাবে, মনও হবে সমৃদ্ধ। রেল স্টেশনগুলোতে যদি আবার বইয়ের দোকানগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে নতুন প্রজন্ম বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হবে।

সরকারি উদ্যোগ, সামাজিক সচেতনতা আর ব্যক্তিগত আগ্রহ—এই তিনটির সমন্বয়েই পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব। যশোর রেল স্টেশনের বইয়ের দোকানটি টিকে থাকলে, সেটি হবে আমাদের আশার প্রতীক।

যশোর রেল স্টেশনের এই ছোট্ট বইয়ের দোকানটি আজ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি নিয়ে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একসময় মানুষ বই ভালোবাসত, জ্ঞানকে সম্মান করত। আজ সেই ভালোবাসা কমে গেছে, কিন্তু পুরোপুরি হারায়নি।

আমরা যদি আবার বইয়ের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে এই দোকানগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাবে। আর সেই সঙ্গে আমাদের সমাজও ফিরে পাবে তার চিন্তার গভীরতা। কারণ বই শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম নয়, বই মানুষ গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন