Homeট্রেন্ডিং নিউজ৭ আশ্চর্যের মতো আবিষ্কার: গুহার ভেতরে মিলল ৭টি মমি, মানুষেরও নয়

৭ আশ্চর্যের মতো আবিষ্কার: গুহার ভেতরে মিলল ৭টি মমি, মানুষেরও নয়

মিশর ছাড়াও যে মমির গল্প হতে পারে, আর তা যে মানুষের নয়, বরং প্রকৃতির নিজস্ব সৃষ্টি—এই আবিষ্কার সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

Share

শুনলে মনে হয় যেন রূপকথা। ৭ আশ্চর্যের মতোই এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। গুহার গভীর অন্ধকারে সারি দিয়ে পড়ে আছে ৭টি মমি। কিন্তু এই মমি মিশরের নয়। মানুষেরও নয়। এমনকি যে দেশে পাওয়া গেছে, সেখানে আজ আর ওই প্রাণীর অস্তিত্বই নেই। তবুও গবেষকদের সামনে হাজির হয়েছে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষ্য—৭টি চিতা বাঘের মমি।

এই আবিষ্কার শুধু চমকে দেওয়ার মতো নয়, বরং প্রকৃতি, প্রাণীজগৎ এবং আরব উপদ্বীপের অতীত ইতিহাস নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে বিজ্ঞানীদের।

মমি বললেই কেন মিশরের কথা মনে পড়ে

মমি শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মিশরের পিরামিড, ফেরাউন আর হাজার হাজার বছর পুরোনো মানুষের দেহ। মিশরই ছিল সেই দেশ, যেখানে মানুষের মৃত্যুর পর দেহ সংরক্ষণের কৌশল চরম দক্ষতায় আয়ত্ত করা হয়েছিল। বিশেষ নিয়মে দেহ শুকিয়ে, রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে তারা মমি বানাত।

এই কারণেই এতদিন ধরে ধারণা ছিল, মানুষের তৈরি মমি মানেই মিশর। অন্য কোথাও এমন নিদর্শন পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অন্তত সৌদি আরবের মতো মরুভূমি অধ্যুষিত দেশে তো একেবারেই নয়।

সৌদি আরবের গুহায় অবিশ্বাস্য আবিষ্কার

সব ধারণা ভেঙে দিয়ে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আরার শহরের কাছে একটি গুহায় পাওয়া গেল এই ৭টি মমি। গবেষকদের চোখে প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি। কারণ মমিগুলো মানুষের নয়। এগুলো চিতা বাঘের।

আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, বর্তমান সৌদি আরবে চিতা বাঘের কোনো অস্তিত্ব নেই। বহু আগেই এই অঞ্চলে চিতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অথচ সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাণীরাই যেন সময়ের ফাঁদে আটকে থেকে গুহার ভেতরে মমি হয়ে পড়ে আছে।

কে বানাল এই মমি, মানুষ না প্রকৃতি

প্রথম প্রশ্নটাই ছিল, কে মমি করল এই চিতাগুলোকে। কেউ কি ইচ্ছা করে সংরক্ষণ করেছিল? নাকি কোনও ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কারণ ছিল?

বিশেষজ্ঞদের উত্তর পরিষ্কার। এই মমি মানুষের তৈরি নয়। এগুলো প্রকৃতির তৈরি মমি।

হ্যাঁ, প্রকৃতিও মমি তৈরি করতে জানে। কিছু নির্দিষ্ট পরিবেশে প্রাণীর দেহ স্বাভাবিকভাবেই শুকিয়ে যায়, পচন ধরে না। ফলে শত শত, এমনকি হাজার বছর পরও দেহ প্রায় অক্ষত থেকে যায়।

কীভাবে প্রকৃতি মমি বানায়

বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, প্রকৃতির মমি তৈরির জন্য সবচেয়ে দরকার শুষ্ক পরিবেশ। যেমন বরফে ঢাকা হিমবাহ বা অত্যন্ত গরম ও শুকনো অঞ্চল।

সৌদি আরবের এই গুহার ভেতরের আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত শুষ্ক। বাতাস চলাচল সীমিত। আর্দ্রতা প্রায় নেই। এই পরিবেশে চিতাগুলোর দেহ দ্রুত শুকিয়ে যায়। ব্যাকটেরিয়া কাজ করার সুযোগ পায়নি। ফলে দেহ পচেনি। ধীরে ধীরে সেগুলো মমিতে পরিণত হয়েছে।

এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ন্যাচারাল মমিফিকেশন’।

শুধু মমি নয়, মিলেছে হাড়েরও সন্ধান

গবেষকরা শুধু ৭টি চিতার মমিই উদ্ধার করেননি। একই গুহার ভেতর থেকে আরও কয়েকটি চিতার হাড়ও পাওয়া গেছে। এতে ধারণা আরও জোরালো হয়েছে যে, একসময় এই অঞ্চল চিতাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ছিল।

আজ যে সৌদি আরবকে আমরা শুধুই বালু আর মরুভূমির দেশ হিসেবে দেখি, একসময় সেখানে ভিন্ন পরিবেশ ছিল। হয়তো তখন পর্যাপ্ত শিকার আর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে চিতা এখানে বসবাস করত।

সৌদি আরবে চিতা ছিল, কিন্তু কবে

এই আবিষ্কার নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কবে পর্যন্ত সৌদি আরবে চিতা ছিল? তারা কীভাবে বিলুপ্ত হলো?

গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশের ধীরে ধীরে শুষ্ক হয়ে যাওয়া এবং মানুষের শিকার প্রবণতা মিলিয়েই চিতাদের বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। এই মমিগুলো সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের নীরব প্রমাণ।

বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা

এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে। প্রবন্ধ প্রকাশের পর থেকেই বিজ্ঞানী মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

কারণ এই আবিষ্কার শুধু প্রাণীবিদ্যার নয়, বরং আরব উপদ্বীপের প্রাকৃতিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ

একদিকে, সৌদি আরবে চিতার অস্তিত্বের প্রমাণ বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের মতো অতি গরম ও শুষ্ক দেশে মমির অস্তিত্ব আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, প্রকৃতি নিজেই অনেক সময় এমন সংরক্ষণ কৌশল ব্যবহার করে, যা মানুষের তৈরি প্রযুক্তির চেয়েও কম নয়।

ইতিহাস যেন গুহার ভেতর লুকিয়ে ছিল

এই ৭টি চিতার মমি যেন গুহার অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের দরজা খুলে দিয়েছে। তারা কথা বলে না। কিন্তু তাদের উপস্থিতিই জানিয়ে দেয়, এই ভূমি একসময় কেমন ছিল।

একটা সময় ছিল, যখন সৌদি আরব শুধু বালুর দেশ ছিল না। সেখানে ঘুরে বেড়াত চিতা। আর আজ তাদের মমি আমাদের সামনে তুলে ধরছে হারিয়ে যাওয়া এক অধ্যায়।

ভবিষ্যতের গবেষণার নতুন দিগন্ত

গবেষকরা মনে করছেন, এই গুহা ও আশপাশের এলাকায় আরও অনুসন্ধান চালালে আরও চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। হয়তো আরও প্রাণীর দেহাবশেষ, আরও প্রমাণ মিলবে।

এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে আরব উপদ্বীপের জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাণী বিলুপ্তি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে নতুন গবেষণার পথ খুলে দিল।

শেষ কথা

৭ আশ্চর্যের গল্প আমরা বইয়ে পড়ি। কিন্তু সৌদি আরবের এই গুহায় পাওয়া ৭টি চিতা বাঘের মমি প্রমাণ করে, পৃথিবী আজও আমাদের সামনে বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে।

মিশর ছাড়াও যে মমির গল্প হতে পারে, আর তা যে মানুষের নয়, বরং প্রকৃতির নিজস্ব সৃষ্টি—এই আবিষ্কার সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

নীরব গুহার ভেতর পড়ে থাকা এই ৭টি মমি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি কখনোই তার ইতিহাস মুছে ফেলে না। শুধু সময়ের অপেক্ষায় রাখে।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন