গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক এখন স্পষ্টভাবে টানাপোড়েনের মধ্যে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক মন্তব্য, শুল্ক আরোপের ঘোষণা এবং সামরিক ইঙ্গিত পুরো ইউরোপীয় রাজনীতিকে নাড়া দিয়ে দিয়েছে। এতদিন যাকে মিত্রতা আর যৌথ নিরাপত্তার বন্ধনে বাঁধা বলা হতো, সেই সম্পর্কেই এখন বড় প্রশ্নচিহ্ন।
এই সংকট শুধু শুল্ক বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর্কটিক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক আইন এবং বিশ্বশান্তির মতো বড় বিষয়।
গ্রিনল্যান্ড কেন হঠাৎ এত গুরুত্বপূর্ণ
গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ। আয়তনে এটি জার্মানির ছয় গুণেরও বেশি। লোকসংখ্যা কম হলেও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। বরফের নিচে রয়েছে খনিজ, বিরল ধাতু ও সম্ভাব্য জ্বালানি সম্পদ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলছে, আর তাতেই এই সম্পদগুলো আরও সহজলভ্য হয়ে উঠছে।
আরেকটি বড় কারণ এর অবস্থান। উত্তর আমেরিকা আর আর্কটিকের মাঝখানে থাকায় এটি সামরিক দিক থেকে খুবই কৌশলগত। ক্ষেপণাস্ত্র নজরদারি, আগাম সতর্ক ব্যবস্থা আর জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য গ্রিনল্যান্ড আদর্শ জায়গা।
এই কারণেই ট্রাম্প বারবার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”।
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি ও ইউরোপের প্রতিক্রিয়া
গ্রিনল্যান্ড দখলের বিরোধিতা করায় ডেনমার্কসহ ইউরোপের আটটি দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের পণ্যের ওপর প্রথমে ১০ শতাংশ শুল্ক বসানোর কথা জানানো হয়।
ঘোষণা অনুযায়ী, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এই শুল্ক কার্যকর হবে। পরে জুন মাসে তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হতে পারে। গ্রিনল্যান্ড বিক্রির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক বহাল থাকবে বলেও স্পষ্ট করে জানান ট্রাম্প।
এই সিদ্ধান্ত ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার একে “সম্পূর্ণ ভুল পদক্ষেপ” বলে আখ্যা দেন। তাঁর মতে, ন্যাটোভুক্ত মিত্রদের ওপর শুল্ক চাপিয়ে যৌথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ বলেন, এই ধরনের হুমকি “অগ্রহণযোগ্য” এবং ইউরোপ কোনো ভীতি প্রদর্শনে মাথা নত করবে না।
সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উল্ফ ক্রিস্টারসন আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ইউরোপ নিজেকে কখনোই ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে দেবে না।
ন্যাটো ও যৌথ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হলেও এটি ন্যাটোর আওতাভুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। ন্যাটোর মূল নীতি হলো, এক সদস্যের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ।
ডেনমার্ক স্পষ্ট করে বলেছে, গ্রিনল্যান্ডে সামরিক পদক্ষেপ নিলে ন্যাটোর ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যাবে। কারণ জোটের ইতিহাসে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি যেখানে এক সদস্য অন্য সদস্যের বিরুদ্ধে শক্তি ব্যবহার করেছে।
ইউরোপীয় মিত্ররা তাই ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছে, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, এটি পুরো ন্যাটোর যৌথ দায়িত্ব।
গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় সেনা উপস্থিতি
এই অবস্থার মধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য গ্রিনল্যান্ডে সীমিত সংখ্যক সেনা পাঠিয়েছে। এটি মূলত নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ জানিয়েছেন, প্রয়োজনে স্থল, আকাশ ও সমুদ্র—সব ধরনের সম্পদ মোতায়েন করা হবে।
এই সেনা মোতায়েনকে ট্রাম্প “খুবই বিপজ্জনক খেলা” বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এতদিন ইউরোপকে শুল্ক না নিয়ে কার্যত ভর্তুকি দিয়ে এসেছে। এখন ডেনমার্কের সেই দেনা শোধ করার সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো সামরিক উপস্থিতি
বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই গ্রিনল্যান্ডে সামরিকভাবে উপস্থিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে পিটুফিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র নজরদারি কেন্দ্র।
ডেনমার্কের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সেখানে সেনা সংখ্যা বাড়াতেও পারে। কিন্তু মালিকানা দাবি করা একেবারেই ভিন্ন বিষয়।
ট্রাম্পের যুক্তি হলো, রাশিয়া বা চীনের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের মালিক হওয়া দরকার। তবে ইউরোপ এই যুক্তিকে মানতে নারাজ।
বাণিজ্য চুক্তি ও নতুন সংকট
এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে ইউরোপ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কেও। গত বছর ব্রাসেলস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি বড় বাণিজ্য চুক্তি হয়। সেখানে ইউরোপীয় পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ মার্কিন শুল্ক আরোপ এবং ইউরোপে কিছু মার্কিন পণ্যের ওপর শূন্য শতাংশ শুল্কের বিষয়ে সম্মতি ছিল।
এখন সেই চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ইপিপি গ্রুপের প্রধান ম্যানফ্রেড ওয়েবার বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকির পর এই মুহূর্তে চুক্তি অনুমোদন সম্ভব নয়। তিনি মার্কিন পণ্যের ওপর শূন্য শতাংশ শুল্ক স্থগিত রাখারও দাবি তুলেছেন।
গ্রিনল্যান্ডবাসীর প্রতিবাদ
এই পুরো ঘটনার মাঝে গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ মানুষও চুপ করে থাকেনি। প্রস্তাবিত মার্কিন অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
তাদের বক্তব্য পরিষ্কার। তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই ঠিক করতে চায়। কোনো পরাশক্তির দরকষাকষির পণ্য হতে চায় না।
সামনে কী হতে পারে
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু এখন শুধু একটি দ্বীপের প্রশ্ন নয়। এটি বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভারসাম্য, ন্যাটোর ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার বড় পরীক্ষা।
যদি এই সংকট আরও বাড়ে, তাহলে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক গভীর সংকটে পড়তে পারে। আর সমাধানের পথ যদি আলোচনার বদলে চাপ আর হুমকির হয়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বের ওপর।
গ্রিনল্যান্ড আজ যেন বড় শক্তিগুলোর নতুন দাবার বোর্ড। আর সেই খেলায় ভুল চাল মানেই বড় বিপর্যয়।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

