ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে আবারও বড় ধরনের অস্থিরতা। লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্রয়ের পর তীব্র সমালোচনা ও বিস্ফোরক মন্তব্যের মাত্র এক দিনের মধ্যেই প্রধান কোচ রুবেন আমোরিমকে বরখাস্ত করেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। মাত্র ১৪ মাস দায়িত্ব পালনের পর এমন আকস্মিক সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
লিডসের বিপক্ষে ড্রই শেষ ধাক্কা
রবিবার প্রিমিয়ার লিগে এল্যান্ড রোডে লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ম্যাচটি এমনিতেই ছিল চাপের, তার ওপর ফলাফল সন্তোষজনক না হওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েন আমোরিম। তবে আসল বিস্ফোরণ ঘটে ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে।
সেখানে ইউনাইটেড বোর্ডের আস্থা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আমোরিম সরাসরি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, তিনি শুধু কোচ নন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের “ম্যানেজার” হিসেবেই কাজ করতে এসেছেন। এই মন্তব্যই ক্লাব বোর্ডের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এনে দেয়।
একদিন পরই বরখাস্ত, ইউনাইটেডের দ্রুত পদক্ষেপ
লিডস ম্যাচের পরপরই ক্লাব জরুরি বৈঠকে বসে। প্রধান নির্বাহী ওমর বেরেরাদা এবং ফুটবল পরিচালক জেসন উইলকক্স পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলেই ১৪ মাস দায়িত্ব পালনের পর রুবেন আমোরিমকে বরখাস্ত করা হয়।
ক্লাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। তবে প্রিমিয়ার লিগে ভালো অবস্থানে শেষ করার জন্য পরিবর্তন আনা জরুরি বলেই মনে করেছে ইউনাইটেড নেতৃত্ব।
ড্যারেন ফ্লেচারের কাঁধে অন্তর্বর্তী দায়িত্ব
আমোরিমের বিদায়ের পর আপাতত দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ক্লাবের সাবেক মিডফিল্ডার ড্যারেন ফ্লেচারকে। বর্তমানে তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অনূর্ধ্ব-১৮ দলের কোচ হিসেবে কাজ করছেন।
বুধবার রাতে বার্নলির বিপক্ষে প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচে তিনিই ইউনাইটেডের ডাগআউটে থাকবেন। দ্য অ্যাথলেটিক জানিয়েছে, মৌসুমের শেষ পর্যন্ত ফ্লেচারকে অন্তর্বর্তীকালীন ম্যানেজার হিসেবে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর পূর্ণকালীন নতুন কোচ নিয়োগের পরিকল্পনা করতে পারে ক্লাব।
ক্লাবের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এক বিবৃতিতে জানায়, “রুবেন আমোরিম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রধান কোচের দায়িত্ব থেকে সরে এসেছেন। তিনি ২০২৪ সালের নভেম্বরে নিযুক্ত হন এবং মে মাসে বিলবাওয়ে উয়েফা ইউরোপা লিগের ফাইনালে দলকে নেতৃত্ব দেন।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “প্রিমিয়ার লিগে দল বর্তমানে ষষ্ঠ স্থানে থাকলেও, ক্লাবের নেতৃত্ব মনে করেছে এই মুহূর্তে পরিবর্তন আনাই সঠিক সিদ্ধান্ত। এতে করে লিগে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য অবস্থানে শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে।”
শেষে ক্লাব আমোরিমকে তার অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানিয়েছে।
যে মন্তব্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়
রবিবার সংবাদ সম্মেলনে আমোরিমের বক্তব্য ছিল বেশ সরাসরি এবং কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন, “আমি এখানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ম্যানেজার হতে এসেছি, শুধু কোচ হতে নয়। এটা শুরু থেকেই পরিষ্কার ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “আমি জানি আমার নাম টুখেল, কন্তে বা মরিনহো নয়। তবুও আমি এই ক্লাবের ম্যানেজার। বোর্ড যদি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি ১৮ মাস পর হোক। আমি পদত্যাগ করব না।”
এই মন্তব্যগুলোই বোর্ডের সঙ্গে তার দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আমোরিম যুগের সংক্ষিপ্ত হিসাব
২০২৪ সালের নভেম্বরে এরিক টেন হ্যাগের স্থলাভিষিক্ত হয়ে স্পোর্টিং লিসবন থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে আসেন রুবেন আমোরিম। শুরুটা আশাব্যঞ্জক হলেও খুব দ্রুতই ফলাফলের ধারাবাহিকতা হারায় দল।
তার অধীনে ইউনাইটেড ৬৩ ম্যাচ খেলেছে, যার মধ্যে জিতেছে মাত্র ২৪টি। প্রিমিয়ার লিগে একটি মৌসুমে দল শেষ করেছিল ১৫তম স্থানে, যা ক্লাবের ইতিহাসে অন্যতম হতাশাজনক অধ্যায়। ইউরোপা লিগের ফাইনালে উঠলেও টটেনহ্যামের কাছে হেরে শিরোপা স্বপ্ন ভেঙে যায়।
বর্তমান মৌসুমে উলভস ও লিডসের বিপক্ষে টানা দুটি ১-১ গোলে ড্রয়ের পর ইউনাইটেড লিগ টেবিলে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে।
ট্রান্সফার নীতি নিয়ে দ্বন্দ্ব
আমোরিমের বিদায়ের পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ট্রান্সফার নীতি নিয়ে মতবিরোধ। জানুয়ারির ট্রান্সফার উইন্ডো নিয়ে ক্লাব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার চিন্তার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
ক্রিসমাসের আগে তিনি বলেছিলেন, “আমরা যদি নিখুঁত ৩-৪-৩ খেলতে চাই, তাহলে অনেক টাকা এবং সময় লাগবে। এখন বুঝতে পারছি, সেটা হয়তো সম্ভব নয়।”
এই বক্তব্য বোর্ডকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি বলেই মনে করছেন অনেকেই।
ইনজুরি ও আন্তর্জাতিক ব্যস্ততায় বিপর্যস্ত দল
আমোরিমের সময়ে ইনজুরিও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ক্লাব অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেসসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় চোটে পড়েন। পাশাপাশি ব্রায়ান এমবেউমো, আমাদ ও নৌসাইর মাজরাউই আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসে ব্যস্ত থাকায় দল গঠনে ভোগান্তি বাড়ে।
শেষ ১১টি লিগ ম্যাচের মধ্যে ইউনাইটেড জিতেছে মাত্র তিনটি। কারাবাও কাপ থেকে গ্রিমসবির কাছে লজ্জাজনক বিদায়ের পর ইউরোপে খেলার স্বপ্নও ভেঙে গেছে।
সামনে ইউনাইটেডের পথচলা
রুবেন আমোরিম অধ্যায়ের সমাপ্তির পর এখন বড় প্রশ্ন—ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোন পথে হাঁটবে? ড্যারেন ফ্লেচার কি অন্তর্বর্তী দায়িত্বে দলকে স্থিতিশীল করতে পারবেন, নাকি নতুন কোনো বড় নাম দেখা যাবে ওল্ড ট্রাফোর্ডে?
একটা বিষয় নিশ্চিত, ইউনাইটেডে পরিবর্তনের ঝড় থামছে না। আর এই পরিবর্তনের চাপ সরাসরি পড়ছে মাঠের ফলাফলের ওপর।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

