সাতক্ষীরায় হঠাৎ আঘাত হানা কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রবিবার (২৯ মার্চ) রাত প্রায় ১০টার দিকে শুরু হওয়া এই ঝড় মুহূর্তের মধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকাকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়।
তীব্র বাতাস, বজ্রপাত এবং শিলাবৃষ্টির সম্মিলিত আঘাতে অসংখ্য ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গাছপালা উপড়ে পড়েছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঝড়ের তাণ্ডবে অনেক পরিবারের টিনের চাল উড়ে গেছে, ফলে তারা বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন। হঠাৎ এই দুর্যোগে মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ঝড়টি ছিল অত্যন্ত তীব্র ও ভয়ংকর। শুরুতেই প্রবল বাতাস বইতে থাকে, যা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঝড়ে রূপ নেয়। বাতাসের গতি এতটাই বেশি ছিল যে শক্তপোক্ত ঘরের চাল পর্যন্ত টিকতে পারেনি। ঝড়ের সাথে থাকা শিলাবৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
রাতের অন্ধকারে হঠাৎ এমন দুর্যোগে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘর ছেড়ে বাইরে বের হয়ে আসেন। বিদ্যুতের তারের ওপর গাছের ডাল ভেঙে পড়ায় পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়, যা পরিস্থিতিকে আরও আতঙ্কজনক করে তোলে।
ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতা সত্যিই হৃদয়বিদারক। সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা জবেদা খাতুন জানান, ঝড়ের সময় তার ঘরের টিনের চাল উড়ে গিয়ে ভেতরের সব আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল। এখন কোথায় থাকব, কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।”
একই এলাকার বিউটি খাতুন ও এরশাদ হোসেন জানান, ঝড়ের ভয়াবহতা এতটাই বেশি ছিল যে তারা প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে বাইরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তাদের মতে, জীবনে এমন তীব্র ঝড় তারা আগে কখনো দেখেননি।
কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়েছে। গাছের ডাল ও গাছ উপড়ে পড়ে বিদ্যুতের লাইনের ওপর পড়ে যাওয়ায় বহু এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ ফিরে আসেনি। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া, কিছু এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়েছে। রাস্তার ওপর গাছ পড়ে থাকায় যান চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ শুরু করেছে, তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ঝড়ের আরেকটি বড় ক্ষতি হয়েছে কৃষি খাতে। শিলাবৃষ্টির কারণে চলতি মৌসুমের আমের মুকুল এবং অন্যান্য ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কৃষক তাদের বছরের পরিশ্রম এক রাতেই হারিয়ে ফেলেছেন।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, শিলাবৃষ্টির আঘাতে আমের মুকুল ঝরে গেছে, ফলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। এছাড়া, বিভিন্ন সবজি ক্ষেত ও অন্যান্য কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে করে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্নব দত্ত জানিয়েছেন, ঝড়ের পর থেকেই প্রশাসন সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্ষয়ক্ষতির খবর সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জরুরি সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।



