বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে আবারও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে, যা ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। টানা কয়েক দফা দাম বৃদ্ধির পর সর্বশেষ ঘোষণায় প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) কর্তৃক নির্ধারিত এই নতুন মূল্য দেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাজার এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সাম্প্রতিক ঘোষণায় দেখা যায়, প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ৩,২৬৬ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ২,৪৭,৯৭৭ টাকায়, যা দেশের বাজারে এক নতুন উচ্চসীমা নির্দেশ করে। মাত্র একদিন আগেও এই দাম ছিল ২,৪৪,৭১১ টাকা, যা থেকে বোঝা যায় স্বর্ণের বাজার কতটা অস্থির হয়ে উঠেছে।
এই দাম বৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণ ক্রয় আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিয়ে বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বর্ণের ব্যবহার বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এর প্রভাব ব্যাপক।
বর্তমানে বাজারে স্বর্ণের বিভিন্ন ক্যারেট অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন—
- ২২ ক্যারেট স্বর্ণ: ২,৪৭,৯৭৭ টাকা প্রতি ভরি
- ২১ ক্যারেট স্বর্ণ: ২,৩৬,৭২১ টাকা প্রতি ভরি
- ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ: ২,০২,৮৯৫ টাকা প্রতি ভরি
- সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ: ১,৬৫,২৭৯ টাকা প্রতি ভরি
এই মূল্য নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রেখেছে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতি।
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণ নিচে তুলে ধরা হলো—
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বর্তমানে প্রতি আউন্সে ৪,৬৭৫ ডলারের বেশি ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই ঊর্ধ্বগতি সরাসরি দেশের বাজারে প্রভাব ফেলছে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণে ঝুঁকে পড়ে, ফলে চাহিদা বেড়ে যায় এবং দাম বাড়ে।
তেজাবি বা বিশুদ্ধ স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে দাম বাড়াচ্ছেন।
ডলারের মান বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি স্বর্ণের দাম বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ স্বর্ণ সাধারণত ডলারে মূল্যায়িত হয়।
গত জানুয়ারির শেষ দিকে স্বর্ণের দাম এক লাফে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একদিনেই প্রতি ভরিতে ১৬,২১৩ টাকা বাড়িয়ে স্বর্ণের দাম ২,৮৬,০০০ টাকায় পৌঁছেছিল, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
যদিও বর্তমানে দাম কিছুটা কম থাকলেও তা এখনও অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই ওঠানামা বাজারের অস্থিরতারই প্রতিফলন।
স্বর্ণের দাম বাড়লেও রুপার বাজারে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বর্তমানে রুপার দাম নিম্নরূপ—
- ২২ ক্যারেট রুপা: ৫,৭১৫ টাকা প্রতি ভরি
- ২১ ক্যারেট রুপা: ৫,৪২৪ টাকা প্রতি ভরি
- ১৮ ক্যারেট রুপা: ৪,৬৬৬ টাকা প্রতি ভরি
- সনাতন পদ্ধতির রুপা: ৩,৫০০ টাকা প্রতি ভরি
রুপার দাম স্থিতিশীল থাকায় অনেক ক্রেতা বিকল্প হিসেবে রুপার দিকে ঝুঁকছেন।
স্বর্ণ দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি কতটা লাভজনক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তাহলে স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে। তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে দাম কিছুটা কমতেও পারে।



