বিশ্ব রাজনীতি আর তেলের বাজার—এই দুটো জিনিস এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে একটায় আগুন লাগলে অন্যটা নিজে থেকেই গরম হয়ে যায়।
ঠিক এমনটাই ঘটেছে সম্প্রতি, যখন Donald Trump ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে ইরানকে “অত্যন্ত কঠোরভাবে আঘাত” করা হবে। আর এই এক কথাতেই বিশ্বজুড়ে তেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে গেছে।
চল একটু সহজভাবে বুঝি—কেন একটা বক্তব্যেই তেলের দাম এত বাড়ে, আর এর পেছনে আসলে কী চলছে।
হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত প্রায় শেষের দিকে। তবে তিনি একই সঙ্গে হুঁশিয়ারিও দেন—যদি ইরান চুক্তিতে না আসে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর সামরিক হামলা চালানো হবে।
এই ধরনের কথা শুনে বাজার কী ভাবে? বাজার ভাবে—“যুদ্ধ বাড়তে পারে, তেল সরবরাহ বন্ধ হতে পারে।” আর তখনই দাম বাড়তে শুরু করে।
এই বক্তব্যের পরপরই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলারে পৌঁছে যায়। শুধু তেল নয়, শেয়ার বাজারও পড়ে যায়, বিশেষ করে এশিয়ার বাজারে।
এখানে একটা জায়গার নাম বারবার আসছে—Strait of Hormuz।
এই প্রণালীটা পারস্য উপসাগর আর আরব সাগরের মাঝখানে একটা সরু পথ। বিশ্বের প্রায় ২০% তেল এখান দিয়ে যায়। মানে, এটা এক ধরনের “তেলের মহাসড়ক”।
এখন যদি এই রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে কী হবে? খুব সহজ—তেলের জাহাজ চলাচল কমে যাবে, সরবরাহ কমবে, আর দাম বেড়ে যাবে।
ট্রাম্পের ভাষণে এই জায়গাটাই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। তিনি মিত্র দেশগুলোকেও বলেছেন, “সাহস দেখাও, গিয়ে এই প্রণালী নিজেদের মতো ব্যবহার করো।”
NATO-এর দেশগুলোর ওপর ট্রাম্প বেশ ক্ষুব্ধ। তার অভিযোগ—তারা হরমুজ প্রণালী রক্ষায় এগিয়ে আসছে না।
তিনি এমনও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র এই সামরিক জোট থেকে সরে যেতে পারে। যদিও তার সাম্প্রতিক ভাষণে তিনি সরাসরি ন্যাটোর নাম উল্লেখ করেননি, কিন্তু চাপটা স্পষ্ট।
একভাবে বললে, ট্রাম্প বলছেন—“আমরা একা সব করব না, তোমরাও এগিয়ে আসো।”
ট্রাম্প বলছেন যুদ্ধ “শিগগিরই শেষ হবে”, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি আবার বলছেন—আগামী দুই-তিন সপ্তাহে আরও কঠোর হামলা হবে।
এটা একটু দ্বৈত বার্তার মতো শোনায়, তাই না?
একদিকে তিনি বলছেন সব শেষের পথে, আবার অন্যদিকে বলছেন যুদ্ধ আরও তীব্র হবে। এই ধরনের অনিশ্চয়তাই বাজারকে বেশি ভয় পাইয়ে দেয়।
অনেকেই ভাবতে পারে—“যুদ্ধ তো সব সময় হয়, তাহলে এবার এত প্রভাব কেন?”
কারণটা খুব বাস্তব:
যদি ইরান তেলের জাহাজে হামলা চালায় বা পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের ঘাটতি তৈরি হবে।
ট্রাম্প সরাসরি ইরানকেই দায়ী করেছেন। তার মতে, ইরান “অস্থিতিশীল আচরণ” করে তেলের বাজারকে ভয় দেখাচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবে বাজার শুধু কথার ওপর নয়, সম্ভাবনার ওপর চলে। আর এই সম্ভাবনাই এখন তেলের দাম বাড়াচ্ছে।
ট্রাম্প একটা মজার প্রস্তাবও দিয়েছেন—তিনি বলেছেন, অন্যান্য দেশগুলো যেন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই তেল কেনে।
তার যুক্তি হলো, আমেরিকার কাছে পর্যাপ্ত তেল আছে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করলেও চলবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব দেশ একসাথে সরবরাহ বদলাতে পারে না। তাই হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব এখনো অনেক বেশি।
ট্রাম্প ইরানকে বিশ্বের “সবচেয়ে সহিংস ও ভয়ংকর শাসন” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেন, ইরান নিজেদের জনগণকেও দমন করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে অস্থিরতা তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না পায়—এটাই তার প্রধান লক্ষ্য।
এখানে বিষয়টা একটু বড়। এটা শুধু তেলের দাম নয়, নিরাপত্তা আর ক্ষমতার লড়াইও।
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক নয়, আমেরিকার ভেতরেও পড়েছে।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমে গিয়েছিল। পরে যখন তিনি যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত দেন, তখন আবার কিছুটা বেড়ে যায়।
মানে, মানুষ চায় যুদ্ধ শেষ হোক, কিন্তু একই সঙ্গে তারা নিরাপত্তাও চায়।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এরপর কী?
যদি হরমুজ প্রণালী আবার স্বাভাবিক হয়, তাহলে তেলের দাম কমে আসতে পারে। ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, তখন বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে।


