বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাম্প্রতিক এক ভাষণে তিনি সরাসরি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। এই মন্তব্য শুধু কূটনৈতিক মহলেই নয়, বরং বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ ন্যাটোকে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বক্তব্য, ইউরোপীয় মিত্রদের অবস্থান, এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। চলুন পুরো বিষয়টা সহজভাবে বুঝে নেওয়া যাক।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ভাষণে স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি ন্যাটো নিয়ে “বিরক্ত” এবং এই জোটকে তিনি আর আগের মতো কার্যকর মনে করেন না। এমনকি তিনি ন্যাটোকে “পেপার টাইগার” বা কাগুজে বাঘ বলে উল্লেখ করেছেন, যার মানে হলো—বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী মনে হলেও বাস্তবে ততটা কার্যকর নয়।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুরাও ন্যাটোকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানকে সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তখন ট্রাম্পের ক্ষোভ আরও বেড়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা চলছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ন্যাটোর অন্যান্য সদস্য দেশও সরাসরি অংশ নিক। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ইউরোপের বড় দেশগুলো এই যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—এটি তাদের যুদ্ধ নয়।
এখানেই ট্রাম্পের হতাশা সবচেয়ে বেশি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় মিত্রদের পাশে দাঁড়ায়, কিন্তু যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়, তখন তারা পাশে থাকে না।
ইতালি, স্পেনসহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়নি। এমনকি তাদের আকাশসীমাও ব্যবহারে বাধা দিয়েছে।
এই পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে, ইউরোপীয় দেশগুলো এই সংঘাত থেকে দূরে থাকতে চায়। তারা সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে নিজেদের ঝুঁকিতে ফেলতে রাজি নয়।
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হরমুজ প্রণালী। এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। কিন্তু ইরানের নিয়ন্ত্রণের কারণে এই পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
ফলাফল হিসেবে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব পড়ছে—জ্বালানির দাম বাড়ছে, পরিবহন খরচ বাড়ছে, এমনকি নিত্যপণ্যের দামও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোকে বলেছেন, তারা যেন নিজেরাই তেলের ব্যবস্থা করে বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কেনে।
ট্রাম্পের মতে, ন্যাটো তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে না। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটে জোটের নিষ্ক্রিয়তা তাকে হতাশ করেছে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে ইউক্রেনের প্রসঙ্গ টানেন। তার দাবি, ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমস্যা না হলেও তারা সেখানে সহায়তা করেছে। কিন্তু এখন যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তখন ন্যাটো তাদের পাশে নেই।
ট্রাম্প শুধু ন্যাটো নয়, আলাদাভাবে যুক্তরাজ্যকেও সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, ব্রিটিশ নৌবাহিনী আগের মতো শক্তিশালী নয় এবং তাদের সামরিক প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়।
এই মন্তব্য অবশ্য যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার জবাবে বলেন, ন্যাটো এখনো বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর সামরিক জোট। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাজ্য সবসময় নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।
এছাড়া তিনি ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্মেলন আয়োজন করা হবে।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে। এরপর হরমুজ প্রণালীর দায়িত্ব সেই দেশগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে, যারা এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
এর মানে হলো, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে এই সংঘাত থেকে সরে এসে অন্যদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের কোনো আস্থা নেই।
তিনি বলেন, হুমকি দিয়ে ইরানের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব নয়। বরং এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থলযুদ্ধে জড়ায়, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইরানি কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, এমন হলে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং যেকোনো সময় বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
সবকিছু মিলিয়ে, ট্রাম্পের ন্যাটো ত্যাগের হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক মোড় তৈরি করেছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। এর ফলে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সহজভাবে বললে, এটা অনেকটা এমন একটা বড় টিমে সবাই একসাথে খেলছে, কিন্তু হঠাৎ একজন প্রধান খেলোয়াড় বলে বসলো, “আমি আর খেলব না।” তখন পুরো টিমটাই দুর্বল হয়ে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ন্যাটোর ভেতরে মতপার্থক্য, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিবর্তন, এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সব মিলিয়ে সামনে কী হতে যাচ্ছে, তা এখনো অনিশ্চিত।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—এই সংকট শুধু রাজনীতিবিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও সরাসরি পড়বে। তাই বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে, পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয় এবং এই উত্তেজনা কোথায় গিয়ে থামে।


