সিকিম মানেই শান্ত পাহাড়, মেঘে ঢাকা রাস্তা আর চোখজুড়ানো দৃশ্য। কিন্তু হঠাৎ করে সেই সুন্দর জায়গাটাই এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টানা ভারী বৃষ্টির জেরে উত্তর সিকিমের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ধস নেমেছে। ফলে গ্যাংটক, চুংথাং থেকে লাচেন যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন পর্যটকেরা—শতাধিক মানুষ মাঝপথে আটকে আছেন।
ধরো তুমি পরিবার নিয়ে পাহাড়ে ঘুরতে গেছ, আর হঠাৎ রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল—ঠিক এমন অবস্থার মধ্যেই পড়েছেন বহু পর্যটক। গ্যাংটক থেকে লাচেন এবং চুংথাং থেকে লাচেন যাওয়ার পথে একাধিক জায়গায় বড় ধস নেমেছে। ফলে যারা লাচেনের দিকে যাচ্ছিলেন, তারা চুংথাং এলাকাতেই আটকে পড়েছেন।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি বেশ গুরুতর। কারণ এই রাস্তা শুধু পর্যটকদের জন্যই নয়, স্থানীয়দের যাতায়াতের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধস নামায় অনেক গাড়ি মাঝপথে দাঁড়িয়ে আছে, আর সামনে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল আটকে থাকা মানুষের নিরাপত্তা। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। আটকে পড়া পর্যটকদের জন্য আইটিবিপি শিবির এবং গুরুদ্বারে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। খাবার, বিশ্রাম—সবকিছু যতটা সম্ভব নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
ভাবতে পারো, হঠাৎ করে প্ল্যান করা ট্রিপ এমনভাবে থেমে গেলে কতটা অস্বস্তিকর লাগে। তবুও নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন পর্যটকেরা।
ধস সরানোর কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় এই কাজ সহজ নয়। ভারী বৃষ্টি চলতে থাকলে আবার নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা থাকে। তাই দ্রুত কাজ এগোলেও পুরোপুরি রাস্তা পরিষ্কার করতে সময় লাগছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব রাস্তা চালু করার চেষ্টা চলছে। তবে আবহাওয়া ভালো না হলে কোনো ঝুঁকি নেওয়া হবে না। কারণ নিরাপত্তাই এখানে সবচেয়ে বড় বিষয়।
যেখানে লাচেনের রাস্তা এখনও বন্ধ, সেখানে লাচুংয়ের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। ওই রাস্তায় যে ধস নেমেছিল, তা ইতিমধ্যেই পরিষ্কার করা হয়েছে। ফলে সেখানে আটকে থাকা পর্যটকেরা ধীরে ধীরে গ্যাংটকের দিকে ফিরতে শুরু করেছেন।
এটা একটা ভালো খবর বলা যায়। অন্তত কিছু মানুষ নিরাপদে নিজেদের জায়গায় ফিরতে পারছেন। তবে লাচেনের দিকে যাত্রা আপাতত পুরোপুরি বন্ধ।
পুরো পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে আবহাওয়া দফতরের তরফে। কারণ পাহাড়ে আবহাওয়া হঠাৎ করে বদলে যেতে পারে। একটু আগে রোদ, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবল বৃষ্টি—এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার।
পর্যটকদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এখনই নতুন করে উত্তর সিকিমে ভ্রমণের পরিকল্পনা না করাই ভালো। যারা ইতিমধ্যে সেখানে আছেন, তাদেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
এদিকে শুধু সিকিম নয়, উত্তরবঙ্গেও আবহাওয়া খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন বজ্রবিদ্যুৎ-সহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে বেশিরভাগ জেলায়।
বিশেষ করে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ২৭ মার্চের দিকে এই বৃষ্টির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
শুধু বৃষ্টি নয়, সঙ্গে থাকতে পারে ঝোড়ো হাওয়া। ২৮ এবং ২৯ মার্চের মধ্যে এই জেলাগুলিতে ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া বইতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এটা কিন্তু বেশ বিপজ্জনক হতে পারে, বিশেষ করে পাহাড়ি বা গাছপালায় ঘেরা এলাকায়। তাই আগেভাগেই সাবধান থাকা জরুরি।
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতন থাকা। যদি কেউ এখন সিকিম বা উত্তরবঙ্গে যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন, তাহলে একটু ভেবে দেখাই ভালো। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ট্রিপ পিছিয়ে দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হতে পারে।
আর যারা ইতিমধ্যেই সেখানে আছেন, তাদের জন্য কিছু সহজ কথা—অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে না বের হওয়া, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা, আর নিয়মিত আপডেট জানা।
পাহাড় সবসময়ই সুন্দর, কিন্তু কখনো কখনো ভয়ংকরও হতে পারে। এই ঘটনাটা আবার মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতির সামনে আমরা কতটা অসহায়। তবে ভালো দিক হলো, প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং আটকে থাকা মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
এখন সবার নজর একটাই—কবে আবহাওয়া স্বাভাবিক হবে, আর কবে আবার সেই চেনা ছন্দে ফিরবে সিকিমের জীবন। ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা আর সতর্কতাই ভরসা।



