বিশ্ব প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান Apple আবারও বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোম্পানিটি ঘোষণা করেছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে তারা অতিরিক্ত ৪০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে, যার মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা। এই পরিকল্পনা শুধু একটি বিনিয়োগ নয়—এটি প্রযুক্তি উৎপাদনের ধারা পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে অ্যাপল চায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও উপাদান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রেই তৈরি করতে। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশীয় শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।
অ্যাপলের এই নতুন পরিকল্পনার নাম রাখা হয়েছে “American Manufacturing Program (AMP)”। এই প্রোগ্রামের আওতায় আগামী ১৪ বছরে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করা হবে। লক্ষ্য একটাই—উচ্চমানের প্রযুক্তি পণ্য তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করা।
এর আগে থেকেই অ্যাপল যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে আসছে। নতুন এই উদ্যোগ সেই প্রচেষ্টাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অ্যাপল চারটি নতুন কোম্পানির সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। এগুলো হলো Bosch, Cirrus Logic, TDK এবং Qnity Electronics।
এই কোম্পানিগুলো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি তৈরি করবে, যা আইফোনসহ অন্যান্য অ্যাপল পণ্যে ব্যবহার করা হবে।
অ্যাপলের সিইও Tim Cook এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি আমেরিকান উদ্ভাবন ও উৎপাদনের শক্তিতে। তাই আমরা গর্বিত যে আরও নতুন কোম্পানির সঙ্গে কাজ করে যুক্তরাষ্ট্রেই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তৈরি করতে পারছি।”
এই প্রোগ্রামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—প্রতিটি অংশীদার কোম্পানির নির্দিষ্ট কাজ নির্ধারণ করা হয়েছে।
TDK প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে সেন্সর তৈরি করবে। এই কোম্পানি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে অ্যাপলের সঙ্গে কাজ করছে, তাই তাদের অভিজ্ঞতা এই প্রকল্পে বড় ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে Bosch এবং TSMC একসঙ্গে কাজ করে ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট তৈরি করবে। এই সার্কিটগুলো তৈরি হবে ওয়াশিংটনের ক্যামাসে অবস্থিত একটি কারখানায়। বিশেষ করে আইফোনের “Crash Detection” ফিচারে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এছাড়া Cirrus Logic এবং GlobalFoundries নিউ ইয়র্কের মাল্টা শহরে নতুন সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এই প্রযুক্তি অ্যাপলের জনপ্রিয় Face ID সিস্টেমকে আরও উন্নত করবে, যা আইফোন ও আইপ্যাডে ব্যবহৃত হয়।
Qnity Electronics এবং HD MicroSystems একসঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও প্রযুক্তি উন্নয়ন করবে। অ্যাপল মনে করছে, ভবিষ্যতে তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) উন্নয়নে এই অংশীদারিত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এর আগে অ্যাপল ৬০০ বিলিয়ন ডলারের একটি চার বছরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। সেই পরিকল্পনায় অনেক বড় বড় কোম্পানি ইতোমধ্যেই যুক্ত হয়েছে, যেমন Samsung, Texas Instruments এবং Broadcom।
এই নতুন ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সেই বৃহৎ পরিকল্পনারই একটি সম্প্রসারণ বলা যায়। অর্থাৎ অ্যাপল ধাপে ধাপে যুক্তরাষ্ট্রে একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি উৎপাদন ইকোসিস্টেম তৈরি করছে।
একটা সহজ উদাহরণ ধরো—যদি তুমি নিজের এলাকায় জিনিস তৈরি করতে পারো, তাহলে বাইরের উপর নির্ভর করতে হয় কম। অ্যাপলের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই।
কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে চীনসহ বিভিন্ন দেশের ওপর উৎপাদনের জন্য নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এখন তারা সেই নির্ভরতা কমাতে চাইছে। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ আছে:
প্রথমত, সরবরাহ চেইন নিরাপত্তা বাড়ানো।
দ্বিতীয়ত, দ্রুত উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা।
তৃতীয়ত, স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করা।
এই কৌশল ভবিষ্যতে অ্যাপলকে আরও স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
অনেকে ভাবতে পারে, অ্যাপল হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন শুরু করছে। আসলে বিষয়টা তা নয়।
অ্যাপল ইতোমধ্যেই টেক্সাসে প্রায় ১৮ বছর ধরে Mac Pro তৈরি করছে। এছাড়া তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রেই Mac mini উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে।
এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই নতুন বিনিয়োগগুলো বাস্তবায়ন করা সহজ হচ্ছে।
এই পুরো পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। আধুনিক স্মার্টফোনে AI এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ—যেমন ক্যামেরা, ফেস রিকগনিশন বা ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট।
যখন অ্যাপল নিজ দেশে উন্নত মানের চিপ ও প্রযুক্তি তৈরি করবে, তখন তাদের AI সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। এতে ভবিষ্যতের আইফোন ও অন্যান্য ডিভাইস আরও স্মার্ট ও দ্রুত হবে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার দীর্ঘদিন ধরে চায়, বড় কোম্পানিগুলো যেন দেশের ভেতরেই উৎপাদন করে। এজন্য বিভিন্ন শুল্ক নীতি চালু করা হয়েছে।
অ্যাপল এই নীতির কিছু সুবিধাও পেয়েছে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় পাওয়ায় কোম্পানিটি সহজেই এই ধরনের বড় বিনিয়োগ করতে পারছে।
সব মিলিয়ে, অ্যাপলের এই ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ শুধু একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির দিক পরিবর্তনের একটি বড় পদক্ষেপ।
এতে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে অ্যাপল তাদের পণ্যের গুণগত মান ও নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়াতে পারবে।
সহজভাবে বললে, অ্যাপল এখন এমন একটা অবস্থান তৈরি করছে যেখানে তারা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে পারবে—বাইরের উপর কম নির্ভর করে, নিজের শক্তিতে আরও এগিয়ে যেতে পারবে।



