পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঘরমুখী মানুষের ঢল নামতেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পদ্মা সেতুতে তৈরি হয়েছে নতুন রেকর্ড। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সেতুটি দিয়ে ৪১ হাজারের বেশি যানবাহন পারাপার হয়েছে, আর টোল আদায় হয়েছে সাড়ে ৪ কোটিরও বেশি টাকা। এমন ব্যস্ততা আর অর্থনৈতিক প্রবাহ একসাথে খুব কমই দেখা যায়। এই ঘটনা শুধু একটি রেকর্ড নয়, বরং দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার বড় একটি সফলতার গল্পও বলে দেয়।
ঈদের সময় মানুষ যখন বাড়ি ফেরার জন্য ছুটে যায়, তখন সড়কপথে চাপ বাড়ে—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এবার সেই চাপকে সুন্দরভাবে সামলে নিয়েছে পদ্মা সেতু। মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে বুধবার রাত ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় মোট ৪১ হাজার ৮৮৫টি যানবাহন সেতুটি পার হয়েছে। ভাবতে পারো, প্রতি মিনিটে কত গাড়ি পার হচ্ছে! তবুও কোথাও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়নি—এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। এই বিশাল যানবাহন চলাচলের ফলে দুই প্রান্তের টোল প্লাজা থেকে মোট ৪ কোটি ৫৪ লাখ ৫ হাজার ২৫০ টাকা আদায় হয়েছে।
যা এখন পর্যন্ত অন্যতম সর্বোচ্চ টোল সংগ্রহ হিসেবে ধরা হচ্ছে। সেতুর মাওয়া প্রান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এখানে ২৮ হাজার ৩৯০টি গাড়ি চলাচল করেছে, আর টোল আদায় হয়েছে ২ কোটি ৬৬ লাখ ৯৫ হাজার ৫৫০ টাকা। এটা বুঝতেই পারছো, ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় মাওয়া অংশটায় চাপটা একটু বেশি থাকে। কিন্তু তারপরও যানজটের তেমন খবর পাওয়া যায়নি। কারণ, আগে থেকেই ভালো প্রস্তুতি ছিল।
অন্যদিকে জাজিরা প্রান্ত দিয়েও কম যানবাহন যায়নি। এখানে ১৩ হাজার ৪৯৫টি গাড়ি পার হয়েছে। আর টোল এসেছে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৯ হাজার ৭০০ টাকা। দুই প্রান্ত মিলিয়েই বোঝা যাচ্ছে, দক্ষিণবঙ্গের মানুষ এখন কতটা নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে এই সেতুর ওপর।
যানবাহনের চাপ থাকলেও পুরো এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচল ছিল স্বাভাবিক। এর পেছনে বড় কারণ হলো হাইওয়ে পুলিশ ও সেতু কর্তৃপক্ষের সমন্বিত কাজ। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ টহল দিয়েছে, যাতে কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ফলে যাত্রীরা অনেকটাই নিশ্চিন্তে ভ্রমণ করতে পেরেছেন। এবারের ঈদযাত্রায় একটি ভালো দিক ছিল মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন চালু রাখা।
এতে অন্য গাড়ির সঙ্গে মিশে গিয়ে জট তৈরি হয়নি। তুমি যদি কখনো ভিড়ের মধ্যে বাইক নিয়ে আটকে যাও, তখন বুঝবে আলাদা লেন কতটা স্বস্তির! ঠিক সেই সুবিধাটাই এখানে দেওয়া হয়েছে। টোল আদায়ে সময় কমানোর জন্য প্লাজাগুলোতে অতিরিক্ত বুথ চালু রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল—দুই পদ্ধতিতেই টোল নেওয়া হয়েছে। ফলে গাড়িগুলোকে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়নি। দ্রুত টাকা দেওয়া আর দ্রুত চলে যাওয়া—এই সহজ ব্যবস্থাই ভ্রমণকে আরামদায়ক করেছে।
সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ জানিয়েছেন, সকাল থেকেই কোনো যানজট ছাড়াই গাড়ি চলাচল করেছে। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে টোল প্লাজা এলাকায় বিশেষ পর্যবেক্ষণ টিম কাজ করছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও নিয়মিত টহল দিয়েছেন, যাতে যাত্রীরা নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঈদের যতই কাছাকাছি সময় আসবে, যানবাহনের চাপ আরও বাড়বে। তবে এখন পর্যন্ত যেভাবে পরিস্থিতি সামলানো হচ্ছে, তাতে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা কম। সেতু কর্তৃপক্ষও আশ্বাস দিয়েছে—পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে, তাই যাত্রীদের ভোগান্তি হবে না।
একসময় দক্ষিণবঙ্গের মানুষকে ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু এখন সেই চিত্র পুরো বদলে গেছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে যাতায়াত অনেক সহজ, দ্রুত আর নির্ভরযোগ্য হয়েছে। এখন এই সেতুই হয়ে উঠেছে দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান লাইফলাইন। মানুষ কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে, ব্যবসা-বাণিজ্যও বেড়েছে। এই বিপুল টোল আদায় শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিরও একটি ইঙ্গিত।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে ব্যবসা বাড়ে, সময় বাঁচে, আর অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পদ্মা সেতুর এই সফলতা ভবিষ্যতে আরও বড় উন্নয়নের পথ খুলে দেবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে পদ্মা সেতু শুধু একটি ব্যস্ত পথই নয়, বরং দেশের উন্নয়নের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। এত চাপের মধ্যেও সুন্দরভাবে যান চলাচল চালু রাখা।


