যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কে দিনের আলোয় চলছিল অবৈধভাবে জ্বালানি তেল বিক্রির এক বিস্ময়কর দৃশ্য—যা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ডিপো থেকে তেল পরিবহনকারী একটি ট্রাক মাঝপথে থামিয়ে সেখান থেকেই বালতিতে করে তেল নামানো হচ্ছে এবং তা সরাসরি দোকানে বিক্রি করা হচ্ছে। বিষয়টি শুধু অবৈধই নয়, বরং এটি জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় একটি ইঙ্গিতও বহন করছে।
প্রায় দুই মিনিট ২২ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, একটি তেলবাহী ট্রাক সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাকের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ব্যক্তি বালতি দিয়ে তেল নিচে দিচ্ছেন। নিচে থাকা আরেকজন সেই তেল সংগ্রহ করে পাশের একটি দোকানে নিয়ে যাচ্ছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, খালি বালতি ফেরত নেওয়ার সময় তাতে পানি সদৃশ কোনো তরল ভরে আবার ট্রাকে ঢালা হচ্ছে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি খুবই পরিকল্পিতভাবে এবং নির্ভয়ে করা হচ্ছিল, যেন এটি তাদের কাছে একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দুটোই বেড়ে গেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের সাতমাইল এলাকায়, যা যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের অবৈধ তেল কেনাবেচা হয়ে আসছে।
দোকানটির মালিক হিসেবে আলী হোসেনের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিতভাবে সড়কে চলাচলকারী তেলবাহী গাড়ি থেকে চুরি করা জ্বালানি সংগ্রহ করে তা খুচরা দামে বিক্রি করেন।
এই পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের সাংবাদিক আরিফ মোল্লা। তিনি জানান, আগে থেকেই তার কাছে অভিযোগ ছিল যে খুলনা ডিপো থেকে তেল নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় যাওয়ার পথে চালক ও সহকারীরা মাঝপথে তেল চুরি করে বিক্রি করে।
সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি ঘটনাস্থলে অবস্থান নেন এবং ট্রাকটি আসার পর পুরো ঘটনাটি ভিডিও করেন। তিনি আরও বলেন, এটি কোনো একদিনের ঘটনা নয়—বরং নিয়মিতভাবেই এই চক্র কাজ করছে। যশোর থেকে কালীগঞ্জ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ৩ থেকে ৪ বার তেল নামিয়ে বিক্রি করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তেল চুরির পদ্ধতিটি অত্যন্ত সংগঠিত। প্রথমে ট্রাক থামানো হয় নির্দিষ্ট একটি স্থানে। এরপর বালতি ব্যবহার করে তেল নামানো হয়। পরে সেই জায়গা পূরণ করতে পানি বা অন্য কোনো তরল ব্যবহার করা হয়, যাতে পরিমাণে কোনো পার্থক্য ধরা না পড়ে।
এই কৌশলটি শুধু প্রতারণা নয়, বরং এটি জ্বালানির গুণগত মান নষ্ট করে, যা পরবর্তীতে ব্যবহারকারীদের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আহম্মদ আলী বলেন, এই দোকানটি মহাসড়কের পাশে হলেও একটু ভেতরে অবস্থিত, যাতে সহজে চোখে না পড়ে। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন গাড়ির চালক ও হেলপারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে দোকানটি চোরাই তেল কিনে এবং পরে তা বিভিন্ন যানবাহনে বিক্রি করে।
এতে করে একদিকে যেমন সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হচ্ছে নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহার করে।
যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাফফাত আরা সাঈদ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। তিনি জানান, ভিডিওটি তার নজরে এসেছে এবং ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়, বরং অনেক জায়গাতেই এটি ঘটে থাকে—শুধু ধরা পড়ে না।



