আজকাল একটা জিনিস তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছো ছোট বাচ্চাদের হাতেও এখন মোবাইল। ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম—সবই খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু এই স্বাভাবিক ব্যাপারটাই এখন বড় এক চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস-এ এমনই এক মামলায় বড় সিদ্ধান্ত এসেছে, যেখানে প্রযুক্তি জায়ান্ট Meta ও Google-কে শিশুদের ক্ষতির জন্য দায়ী করা হয়েছে।
সোজা করে বললে, সোশ্যাল মিডিয়া এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যাতে তুমি বারবার সেখানে ফিরে যাও। একবার ভিডিও দেখা শুরু করলে আর থামতে ইচ্ছে করে না—ঠিক যেমন ইউটিউবে একটা ভিডিও থেকে আরেকটা ভিডিওতে চলে যাওয়া।
কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন এই অভ্যাস ছোটদের মধ্যে তৈরি হয়। তাদের মস্তিষ্ক এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ফলে তারা খুব দ্রুত আসক্ত হয়ে পড়ে। এই আসক্তি ধীরে ধীরে তাদের মনোযোগ কমিয়ে দেয়, ঘুমের সমস্যা তৈরি করে, এমনকি আত্মবিশ্বাসও কমিয়ে দেয়।
এই মামলার মূল কেন্দ্র ছিল কেলি নামে এক তরুণী। খুব ছোট বয়সেই সে সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়ে যায়। মাত্র ৬ বছর বয়সে ইউটিউব আর ৯ বছর বয়সে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার শুরু করে।
ধীরে ধীরে এই অভ্যাস তার জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। সে দাবি করে, এই প্ল্যাটফর্মগুলো তাকে আসক্ত করে তোলে এবং তার মানসিক সমস্যাগুলো আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা করা হয় Meta ও Google-এর বিরুদ্ধে।
নয় দিন ধরে দীর্ঘ শুনানি চলে। প্রায় ৪০ ঘণ্টা আলোচনা শেষে জুরি বোর্ড এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়।
তারা বলেছে, এই কোম্পানিগুলো তাদের অ্যাপ এমনভাবে ডিজাইন করেছে, যা ব্যবহারকারীদের—বিশেষ করে শিশুদের—আসক্ত করে তোলে। শুধু তাই না, তারা এই ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতাও দেয়নি।
ফলাফল হিসেবে:
- Meta-কে ৪২ লাখ ডলার
- Google-কে ১৮ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়
মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০ লাখ মার্কিন ডলার।
তুমি ভাবতে পারো, এত বড় কোম্পানির জন্য ৬০ লাখ ডলার খুব একটা বড় কিছু না। আসলেই তাই। কিন্তু এই রায়ের গুরুত্ব টাকা দিয়ে মাপা যাবে না।
এটা একটা শক্ত বার্তা—এখন থেকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আর দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারবে না।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রায় ভবিষ্যতে আরও হাজারো মামলার দরজা খুলে দিতে পারে।
এই মামলার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—এখানে কনটেন্ট নিয়ে অভিযোগ করা হয়নি। বরং অভিযোগ করা হয়েছে অ্যাপের ডিজাইন নিয়ে।
মানে, সমস্যা শুধু ভিডিও বা পোস্টে না—সমস্যা হলো অ্যাপ কীভাবে তোমাকে আটকে রাখে।
উদাহরণ হিসেবে ধরো:
- অটোপ্লে ভিডিও
- ইনফিনিট স্ক্রল
- নোটিফিকেশন দিয়ে বারবার টেনে আনা
এই ফিচারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে ব্যবহারকারী বেশি সময় কাটায়।
জুরি বোর্ড বলেছে, এই ডিজাইনগুলোই আসক্তির মূল কারণ।
এই মামলায় বড় বড় প্রযুক্তি নেতাদেরও দেখা গেছে।
- Mark Zuckerberg
- Adam Mosseri
তাদের আদালতে দাঁড়িয়ে জবাব দিতে হয়েছে।
বিশেষ করে কিশোরীদের জন্য ক্ষতিকর ‘বিউটি ফিল্টার’ কেন বন্ধ করা হয়নি—এই প্রশ্নে জাকারবার্গ বলেন, তারা মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
কিন্তু জুরি বোর্ড এই যুক্তি মানেনি।
না, তারা এই রায় মেনে নেয়নি।
Meta ও Google—দুই প্রতিষ্ঠানই জানিয়েছে, তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবে।
তাদের যুক্তি হলো, সাধারণত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা কনটেন্টের জন্য দায়ী থাকে না।
তবে এই মামলায় বিষয়টা ছিল ভিন্ন—এখানে ডিজাইনকে দায়ী করা হয়েছে।
এই একই অভিযোগে TikTok এবং Snapchat-এর বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছিল।
কিন্তু তারা আদালতে যাওয়ার আগেই গোপন সমঝোতায় পৌঁছে যায়।
মানে, তারা ঝামেলা বাড়াতে চায়নি।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এর পর কী?
যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২০টি অঙ্গরাজ্য ইতিমধ্যে শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইন করেছে।
এই রায়ের পর চাপ আরও বাড়বে। অনেকেই বলছেন, খুব শিগগিরই ফেডারেল পর্যায়ে বড় কোনো আইন আসতে পারে।
সবশেষে একটা কথা বলি, এটা শুধু আমেরিকার ঘটনা না। আমাদের দেশেও একই সমস্যা বাড়ছে।
বাচ্চারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলে কাটাচ্ছে। আমরা হয়তো ভাবি—“ঠিক আছে, সময় কাটাচ্ছে”—কিন্তু ভেতরে ভেতরে এর প্রভাব অনেক গভীর।
তাই একটু সচেতন হওয়া দরকার।
যেমন:
- বাচ্চার স্ক্রিন টাইম কমানো
- বাইরে খেলতে উৎসাহ দেওয়া
- পরিবারে সময় বাড়ানো
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি আমাদের জন্য, আমরা প্রযুক্তির জন্য না।



