স্বপ্ন—এই একটা জিনিস মানুষকে সবসময় ভাবিয়েছে। আমরা ঘুমাই, আর মাথার ভেতর অদ্ভুত সব গল্প চলতে থাকে। কখনো সুখের, কখনো ভয়ঙ্কর। কিন্তু একটা সময় পর্যন্ত আমরা ভাবতাম, এগুলো পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
এখন ধীরে ধীরে সেই ধারণা বদলাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, খুব শিগগিরই এমন সময় আসতে পারে যখন আমরা শুধু স্বপ্নের মানে বোঝার চেষ্টা করব না, বরং নিজের ইচ্ছামতো স্বপ্ন “তৈরি” করতেও পারব। এই নতুন ধারণাটার নাম—ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং বা স্বপ্ন প্রকৌশল।
সহজভাবে বললে, ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং হলো এমন একটা কৌশল যেখানে ঘুমানোর আগে কিছু নির্দিষ্ট চিন্তা, ছবি বা শব্দ মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ঘুমের মধ্যে সেই বিষয়গুলো নিয়েই স্বপ্ন দেখা যায়।
ভাবো, তুমি ঘুমানোর আগে বারবার সমুদ্রের কথা ভাবছো—ঢেউ, বাতাস, নীল পানি। অনেক সময় দেখা যায়, রাতে স্বপ্নেও তুমি সমুদ্রের ধারে চলে গেছো। এই ঘটনাকেই বিজ্ঞানীরা এখন একটু গভীরভাবে ব্যবহার করতে চাইছেন।
এই পদ্ধতির আরেকটা নাম হলো “ড্রিম ইনকিউবেশন”।
ম্যাসাচুসেটসের ব্রেইনট্রিতে থাকা উইল ডাউড নামে একজন লেখক এই বিষয়টা নিয়ে নিজের ওপরই পরীক্ষা চালান। তার শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি পড়তে পারেন না, চলাফেরাও সীমিত।
তবু তিনি থেমে থাকেননি।
ঘুমানোর সময় তিনি ছোট ছোট অডিও রেকর্ডিং শুনতেন—যেমন কবিতা বা নির্দিষ্ট কোনো চিন্তা। এতে তার স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে।
এক রাতে তিনি দেখলেন, তিনি এক রহস্যময় শহরের মধ্যে হাঁটছেন, যেখানে চারপাশে পানি আর অদ্ভুত আলো। আবার কখনো দেখেছেন, চাঁদের আলোয় শেয়ালের সাথে দৌড়াচ্ছেন।
তিনি বলেছিলেন, এটা যেন স্বপ্নে “জ্বালানি” ঢালার মতো।
এই অভিজ্ঞতা শুধু তাকে আনন্দই দেয়নি, তার ভবিষ্যতের বই লেখার জন্য আইডিয়াও দিয়েছে।
এই ধারণা একেবারে নতুন না।
প্রাচীন গ্রীস বা থাইল্যান্ডে মানুষ মন্দিরে গিয়ে স্বপ্নের মাধ্যমে কোনো বার্তা পাওয়ার চেষ্টা করত। তবে আধুনিক বিজ্ঞান এই বিষয়টাকে নতুনভাবে দেখছে।
২০০০ সালের দিকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রবার্ট স্টিকগোল্ড একটা মজার বিষয় খেয়াল করেন।
যারা ঘুমানোর আগে টেট্রিস গেম খেলতেন, তারা স্বপ্নেও একই ধরনের আকার—যেমন পড়তে থাকা ব্লক—দেখতেন। এটাকে বলা হয় “টেট্রিস এফেক্ট”।
মানে, আমরা ঘুমানোর আগে যা দেখি বা ভাবি, সেটাই অনেক সময় স্বপ্নে চলে আসে।
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এখন নতুন নতুন প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে।
এমআইটির গবেষক অ্যাডাম হোরোভিটজ “ডর্মিও” নামে একটা ডিভাইস তৈরি করেছেন।
এই যন্ত্রটা ঘুমানোর সময় মানুষের শরীরের সিগন্যাল দেখে বুঝতে পারে, সে কখন ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় আছে। এই অবস্থাটাকে বলে “হিপনাগোজিয়া”।
ঠিক এই সময় যন্ত্রটি কানে কিছু নির্দেশ দেয়, যেমন—“জলের মতো একটা দৃশ্য কল্পনা করো।”
এর ফলে অনেক মানুষই সেই বিষয় নিয়েই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০% এর বেশি মানুষ এইভাবে নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন।
এখানেই বিষয়টা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।
স্বপ্ন শুধু বিনোদন নয়, এটা আমাদের মনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
ধরো, কেউ বারবার দুঃস্বপ্ন দেখছে। এতে তার ঘুম খারাপ হয়, মন খারাপ থাকে, ভয় কাজ করে। ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে সেই দুঃস্বপ্নকে ধীরে ধীরে ভালো স্বপ্নে বদলানো সম্ভব হতে পারে।
একজন মা, মেয়ার লুকাস, তার ছেলেকে হারানোর পর দীর্ঘদিন দুঃস্বপ্নে ভুগছিলেন। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর একবার তিনি তার ছেলেকে নিয়ে একটা শান্ত, সুন্দর স্বপ্ন দেখেন।
এই একটা স্বপ্নই তার জীবনে বড় পরিবর্তন আনে। এরপর তার দুঃস্বপ্ন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
এমন অভিজ্ঞতা থেকেই বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, ভবিষ্যতে PTSD, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার চিকিৎসায় এই পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে।
ভাবো, এমন একটা জায়গা আছে যেখানে তুমি গিয়ে বললে—“আমি দুঃস্বপ্ন দেখতে চাই না” বা “আমি সৃজনশীল হতে চাই”—আর ডাক্তার তোমার স্বপ্ন সেট করে দিল!
শুনতে একটু সিনেমার মতো লাগলেও, বিজ্ঞানীরা বলছেন এটা একেবারে অসম্ভব নয়।
ধীরে ধীরে “স্বপ্ন ক্লিনিক” বাস্তবেও দেখা যেতে পারে।
তবে সবকিছুর মতো এরও একটা অন্ধকার দিক আছে।
২০২১ সালে “কুর্স” নামে একটি বিয়ার ব্র্যান্ড এমন একটা বিজ্ঞাপন দেয়, যেখানে মানুষকে ঘুমানোর আগে তাদের পণ্যের ছবি দেখতে বলা হয়, যাতে তারা স্বপ্নেও সেই পণ্য দেখে।
অনেক বিজ্ঞানী এতে আপত্তি জানান।
তাদের কথা হলো, ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক একেবারে ব্যক্তিগত জায়গা। সেখানে যদি বিজ্ঞাপন ঢুকে পড়ে, তাহলে সেটা আমাদের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হতে পারে।
ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং এখনো পুরোপুরি পরিণত হয়নি, কিন্তু সম্ভাবনা বিশাল।
একদিকে এটা মানুষের সৃজনশীলতা বাড়াতে পারে, নতুন আইডিয়া দিতে পারে, মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারে।
অন্যদিকে, ভুলভাবে ব্যবহার করলে এটা মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তা ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করার একটা বিপজ্জনক হাতিয়ারও হয়ে উঠতে পারে।
শেষ কথা হলো—স্বপ্ন আর শুধু রহস্য না। এটা এখন ধীরে ধীরে আমাদের হাতের নাগালে চলে আসছে।
ভাবো তো, যদি একদিন তুমি ঠিক করে নিতে পারো—আজ রাতে কী স্বপ্ন দেখবে!
তাহলে ঘুম আর শুধু বিশ্রাম থাকবে না, হয়ে উঠবে নিজের মনকে নতুনভাবে গড়ার একটা শক্তিশালী মাধ্যম।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।



