Homeওয়েস্ট বেঙ্গলনিপা ভাইরাস কী? উপসর্গ, সংক্রমণের পথ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

নিপা ভাইরাস কী? উপসর্গ, সংক্রমণের পথ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

Share

নতুন করে আবার বাংলার মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে নিপা ভাইরাস। সম্প্রতি বারাসতে দু’জনের শরীরে এই মারাত্মক জীবাণুর উপস্থিতি মিলেছে। স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বেড়েছে। রাজ্য সরকার পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু ভয় না পেয়ে আগে পরিষ্কারভাবে জানা দরকার—নিপা ভাইরাস আসলে কী, কীভাবে এটি ছড়ায়, কী কী লক্ষণ দেখা দেয় এবং নিজেকে ও পরিবারকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়।

ভাবুন তো, সাধারণ একটা জ্বর বা মাথাব্যথা যদি ধীরে ধীরে এমন অবস্থায় নিয়ে যায় যেখানে মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়ছে। নিপা ভাইরাস ঠিক এমনই নীরবে আঘাত হানে। তাই জানাটাই এখানে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

নিপা ভাইরাস কী?

নিপা ভাইরাস একটি ভয়ংকর জুনোটিক ভাইরাস। সহজ ভাষায় বললে, এটি এমন এক ধরনের রোগ যা প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে আসে। মানুষ এবং জন্তু—দু’পক্ষের জন্যই এটি মারাত্মক। এই ভাইরাস মূলত স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফেলাইটিস সৃষ্টি করে। মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বলেই নিপাকে এতটা ভয়ঙ্কর বলা হয়।

নিপা ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়?

এই ভাইরাস ছড়ানোর সবচেয়ে বড় উৎস হলো ফলখেকো বাদুড়। বাদুড় নিজে অসুস্থ না হলেও তাদের শরীরে এই ভাইরাস থাকতে পারে। বাদুড়ের কামড় দেওয়া ফল বা বাদুড়ের বিষ্ঠায় দূষিত ফল খেলে মানুষ সংক্রমিত হতে পারে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংক্রমণের পথ হলো আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শ। পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে তার খুব কাছাকাছি থাকলে, একই বাসন ব্যবহার করলে বা শারীরিক সংস্পর্শে এলে অন্যদের শরীরেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। অতীতে শূকরের মাধ্যমেও মানুষের শরীরে নিপা ঢুকেছে বলে জানা গেছে।

একটু খেয়াল করলে বুঝবেন, গ্রামাঞ্চলে খোলা পরিবেশে রাখা ফল, খেজুর বা তালের কাঁচা রস—সবই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

নিপা ভাইরাসের প্রাথমিক উপসর্গ

নিপা ভাইরাসের লক্ষণ শুরুতে অনেকটাই সাধারণ জ্বরের মতো। তাই অনেক সময় মানুষ গুরুত্ব দেয় না। এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।

শুরুর দিকে জ্বর আসে। সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা হয়। শরীর ভেঙে যায়। বমি বমি ভাব থাকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে কথা জড়িয়ে যায় বা মুখের পেশি শক্ত হয়ে আসে। কাশি দিলে বুকে ব্যথাও অনুভূত হয়।

এই অবস্থায় অনেকেই ভাবেন, “দু’দিনে ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু নিপার ক্ষেত্রে এই অবহেলাই প্রাণঘাতী হতে পারে।

গুরুতর লক্ষণ ও জটিলতা

জ্বর যদি বাড়তে থাকে, তখন পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যায়। রোগী এলোমেলো কথা বলতে শুরু করে। স্মৃতিশক্তি কমে যায়। আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। অনেক সময় মৃগী রোগীর মতো খিঁচুনি শুরু হয়।

এই পর্যায়ে মস্তিষ্কে প্রদাহ দেখা দেয়, যাকে এনসেফেলাইটিস বলা হয়। রোগী ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে কোমায় চলে যেতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। কিছু জায়গায় এই হার আরও বেশি ছিল।

নিপা ভাইরাসের চিকিৎসা কি আছে?

দুঃখজনক হলেও সত্যি, নিপা ভাইরাসের জন্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা টিকা নেই। চিকিৎসা পুরোপুরি উপসর্গের ওপর নির্ভর করে।

রোগীকে সাধারণত ভেন্টিলেটর সুবিধাযুক্ত আইসিইউতে রাখতে হয়। শ্বাসপ্রশ্বাস ঠিক রাখা, জ্বর নিয়ন্ত্রণ, খিঁচুনি বন্ধ করা—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়। কিছু চিকিৎসক পরীক্ষামূলকভাবে ‘রাইবাভিরিন’সহ কয়েকটি অ্যান্টিভাইরাল ব্যবহার করে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়ার দাবি করেছেন। তবে এগুলো এখনো নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে স্বীকৃত নয়।

এই কারণেই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নিপা ভাইরাস প্রতিরোধের উপায়

নিপা ভাইরাস থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সচেতন থাকা। কিছু সহজ অভ্যাস বদলালেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।

বাদুড় বা শূকরের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। এদের মাংস খাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বাদুড়ের কামড় দেওয়া ফল বা মাটিতে পড়ে থাকা ফল খাওয়া একেবারেই উচিত নয়। কাটা ফল খোলার আগে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া জরুরি।

খোলা জায়গায় বিক্রি হওয়া ফলের রস পান করা থেকে বিরত থাকুন। বিশেষ করে খেজুর বা তালের কাঁচা রস এই ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে পারে। বাজার থেকে বোতলজাত রস কিনলেও সতর্ক থাকুন।

কারও জ্বর বা সন্দেহজনক উপসর্গ থাকলে তার খুব কাছাকাছি যাওয়া এড়িয়ে চলুন। হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন।

নিপা ভাইরাসের ইতিহাস ও বাংলার অভিজ্ঞতা

নিপা ভাইরাস প্রথম ধরা পড়ে ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায়। শূকর প্রতিপালকদের মধ্যে এই রোগ প্রথম দেখা যায়। সেখান থেকেই বিশ্বজুড়ে নিপা নিয়ে উদ্বেগ শুরু।

ভারতে নিপা ভাইরাস প্রথম বড় আকারে দেখা দেয় ২০০১ সালে শিলিগুড়িতে। সেখানে ৬৬ জন আক্রান্ত হন এবং ৪৫ জনের মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে একজন চিকিৎসকও ছিলেন, যিনি রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে সংক্রমিত হন। সেখানে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৬৮ শতাংশ।

২০০৭ সালে নদিয়ায় একই পরিবারের চারজন নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এমনকি রোগীর রক্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে এক ব্লাড কালেক্টরও প্রাণ হারান। সেই এলাকায় মৃত্যুর হার ছিল ১০০ শতাংশ।

২০১৮ সালে কেরলের কোঝিকোড়, মল্লপুরমসহ একাধিক এলাকায় নিপা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে। সেখানেও প্রায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয়, নিপা ভাইরাস নতুন কিছু নয়। কিন্তু অবহেলা করলে এর পরিণতি ভয়াবহ।

কেন দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি?

নিপা ভাইরাস এমন এক রোগ যেখানে সময়ই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। যত দ্রুত রোগী চিকিৎসার আওতায় আসবে, বাঁচার সম্ভাবনা ততটাই বাড়বে। উপসর্গ হালকা মনে হলেও দেরি করা যাবে না।

একটু ভাবুন, আগেভাগে হাসপাতালে গেলে হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু দেরি করলে সুযোগ আর থাকে না।

শেষ কথা

নিপা ভাইরাসের নাম শুনলেই ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ভয় নয়, দরকার সচেতনতা। পরিষ্কার তথ্য জানা, সাবধান থাকা এবং উপসর্গ দেখা দিলেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া—এই তিনটি জিনিসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নিজে সতর্ক থাকুন। পরিবারকেও সতর্ক করুন। কারণ এই ধরনের রোগের ক্ষেত্রে একটুখানি অসচেতনতাই বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন