Homeআবহাওয়ামৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি: তীব্র শীতে কাঁপছে বাংলাদেশ, ১০ জেলায় শৈত্যপ্রবাহের...

মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি: তীব্র শীতে কাঁপছে বাংলাদেশ, ১০ জেলায় শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব

শৈত্যপ্রবাহ বলতে বোঝায়, কোনো এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এবং সেই অবস্থা কিছুদিন স্থায়ী হওয়া। বাংলাদেশে শৈত্যপ্রবাহকে সাধারণত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়।

Share

শীত এবার আর শুধু শীত নেই, অনেকের কাছে যেন কাঁপুনি ধরানো বাস্তবতা। ঢাকাসহ সারা দেশে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে শীতের দাপট। ঘন কুয়াশা, হিমেল হাওয়া আর কমতে থাকা তাপমাত্রা মিলিয়ে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে। চলতি শীত মৌসুমে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছে রাজশাহীতে। সেখানে পারদ নেমে এসেছে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা এ মৌসুমের সবচেয়ে কম।

এই তাপমাত্রা শুধু একটি সংখ্যা নয়। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং পরিবহন ব্যবস্থায়। বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হচ্ছে।

রাজশাহীতে মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড

মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি সকালে রাজশাহীতে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এটি চলতি শীত মৌসুমে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। আগের রেকর্ড ছিল ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ৩১ ডিসেম্বর গোপালগঞ্জে নথিভুক্ত হয়েছিল। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই রেকর্ড ভেঙে আরও নিচে নামল পারদ।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, রাতের আকাশ পরিষ্কার থাকা, উত্তরের হিমেল বাতাস এবং কুয়াশার প্রভাব মিলেই তাপমাত্রা এতটা নেমে গেছে। বিশেষ করে ভোরের দিকে শীত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।

১০ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ, জনজীবনে চরম ভোগান্তি

রাজশাহী ছাড়াও দেশের আরও ৯টি জেলায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই জেলাগুলো হলো রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রাঙ্গামাটি, যশোর, কুষ্টিয়া এবং চুয়াডাঙ্গা। এসব এলাকায় সকাল থেকে কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় মানুষ স্বাভাবিক কাজে বের হতে পারছে না।

গ্রামাঞ্চলে শীতের প্রভাব আরও তীব্র। অনেক জায়গায় খড়, পলিথিন কিংবা পাতলা কম্বলই ভরসা। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে শীতজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

শৈত্যপ্রবাহ কী এবং এর ধরন

শৈত্যপ্রবাহ বলতে বোঝায়, কোনো এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এবং সেই অবস্থা কিছুদিন স্থায়ী হওয়া। বাংলাদেশে শৈত্যপ্রবাহকে সাধারণত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়।

যখন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, তখন তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে সেটি মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়। যদি তাপমাত্রা ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে, তখন তাকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। আর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে সেটি অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বর্তমানে রাজশাহীতে যে তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, তা মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের মধ্যেই পড়ে, তবে অনুভূত শীত অনেক সময় আরও বেশি মনে হচ্ছে।

আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী তিন থেকে চার দিন তাপমাত্রা কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। কোথাও কোথাও আরও এক দফা শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে চলতি মাসের ১০ বা ১১ তারিখের পর থেকে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে ঘন কুয়াশা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে ভোরের দিকে সড়ক ও নৌপথে চলাচলে সতর্কতা প্রয়োজন। বিমান চলাচলেও মাঝে মাঝে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

শীতের প্রভাব পড়ছে কৃষি ও অর্থনীতিতে

তীব্র শীত শুধু মানুষের কষ্ট বাড়াচ্ছে না, প্রভাব ফেলছে কৃষি খাতেও। বোরো ধানের চারা, সবজি ক্ষেত এবং শীতকালীন ফসল কুয়াশা ও ঠান্ডার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক কৃষক ভোরের কুয়াশায় জমিতে যেতে দেরি করছেন, ফলে কাজের গতি কমে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন। সকালে কাজে বের হওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। শীতের কারণে আয় কমে যাওয়ায় পরিবার চালানো অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

শীত থেকে বাঁচতে করণীয়

এই ধরনের শৈত্যপ্রবাহে কিছু সতর্কতা মেনে চলা খুব জরুরি। গরম কাপড় ব্যবহার করা, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখা দরকার। ভোরে ও গভীর রাতে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়াই ভালো। শীতজনিত সমস্যা যেমন সর্দি, কাশি বা জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গ্রামাঞ্চলে অসহায় মানুষের জন্য শীতবস্ত্র বিতরণ এখন সময়ের দাবি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ একসঙ্গে হলে অনেক মানুষের কষ্ট কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।

শীতের বাস্তবতা ও সামনের দিনগুলো

বাংলাদেশে জানুয়ারি মানেই শীতের সবচেয়ে কঠিন সময়। তবে এবছর শীতের তীব্রতা যেন একটু বেশিই অনুভূত হচ্ছে। রাজশাহীতে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সেই বাস্তবতারই প্রমাণ। আবহাওয়ার এই পরিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে চলাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আগামী কয়েক দিন সতর্ক থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। শীত হয়তো ধীরে ধীরে কমবে, কিন্তু ততদিন পর্যন্ত সাবধানতা আর সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় রক্ষা।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন