এক মুহূর্তের আতঙ্ক, কয়েক সেকেন্ডের বিভীষিকা। মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হলো মাত্র ২০ দিনের এক দুধের শিশুকে। তারপর তাকে ছুড়ে ফেলা হলো কুয়োর গভীর জলে। শুনলেই গা শিউরে ওঠে। কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে ফিরল সেই সদ্যোজাত কন্যা।
ঘটনাটি ঘটেছে ছত্তীসগঢ়ের জঞ্জগীর-চম্পা জেলার সেভনি গ্রামে। বুধবার সকালে প্রতিদিনের মতোই নিজের বাড়ির উঠোনে বসেছিলেন সুনীতা রাঠৌর। কোলে ছিল তাঁর মাত্র ২০ দিনের শিশুকন্যা। রোদ পোহাচ্ছিলেন দু’জনেই। স্বামী অরবিন্দ রাঠৌর তখন কাজে বেরিয়ে গেছেন। সবকিছু ছিল একেবারে স্বাভাবিক।
ঠিক সেই সময়ই এলাকায় শুরু হয় বাঁদরের উৎপাত। এক বাড়ির ছাদ থেকে অন্য বাড়ির ছাদে লাফাতে থাকে বাঁদরের দল। মুহূর্তের মধ্যেই একটি বাঁদর আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে সুনীতার কোলে। চোখের পলকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নেয় সদ্যোজাত শিশুটিকে।
সুনীতার আর্তচিৎকারে ছুটে আসেন গ্রামবাসীরা। সবাই মিলে শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। বাঁদরদের তাড়াতে চিৎকার, ঢিল ছোড়া, এমনকি শব্দবাজিও ফাটাতে থাকেন অনেকে। কিন্তু তাতেই ঘটে যায় ভয়ংকর ঘটনা।
ভয়ে দিশেহারা হয়ে পালানোর সময় বাঁদরটি শিশুটিকে বাড়ির পাশের একটি কুয়োর মধ্যে ছুড়ে ফেলে দেয়। তারপর দলবল নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
শিশুটি কুয়োয় পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামবাসীরা ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্ধার কাজে। এক মুহূর্তও দেরি না করে কুয়ো থেকে তুলে আনা হয় সদ্যোজাতকে। তখন শিশুটি নিস্তেজ অবস্থায় ছিল।
সেই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন রাজেশ্বরী রাঠৌর নামে এক তরুণী। তিনি পেশায় একজন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নার্স। একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সেভনি গ্রামে এসেছিলেন তিনি। পরিস্থিতি বুঝেই সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকে সিপিআর দিতে শুরু করেন রাজেশ্বরী।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটির জ্ঞান ফিরে আসে। সবাই তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
প্রথমে শিশুটিকে জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে দ্রুত একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে জানান, আশ্চর্যজনকভাবে শিশুটি পুরোপুরি সুস্থ রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত উদ্ধার আর সময়মতো প্রাথমিক চিকিৎসাই শিশুটির প্রাণ বাঁচিয়েছে।
শিশুটির বাবা অরবিন্দ রাঠৌর জানান, তাঁর মেয়েটি সত্যিই ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছে। তিনি বলেন, ডায়পার পরে থাকার কারণেই শিশুটি কুয়োর জলে ডুবে যায়নি, বরং ভেসে ছিল। পাশাপাশি গ্রামবাসীরা এক সেকেন্ডও দেরি করেননি উদ্ধার করতে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থলে একজন প্রশিক্ষিত নার্স উপস্থিত থাকা ছিল আরেকটি অলৌকিক বিষয়। রাজেশ্বরীর দ্রুত সিপিআর দেওয়াই তাঁদের মেয়ের প্রাণ ফিরিয়ে এনেছে।
ঘটনার পর গোটা গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাঁদরের উৎপাত নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। অনেকেই বলছেন, শিশুদের নিয়ে এখন আর উঠোনে বসাও নিরাপদ নয়।
সুনীতা ও অরবিন্দ দু’জনেই রাজেশ্বরী রাঠৌর এবং গ্রামবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাঁদের কথায়, এই সহযোগিতা না পেলে আজ হয়তো মেয়েটিকে ফিরে পেতেন না।
এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়, এক মুহূর্তের অসতর্কতা বা হঠাৎ বিপদ কী ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। একই সঙ্গে এটাও প্রমাণ করে, মানুষের দ্রুত সিদ্ধান্ত, সাহস আর সহানুভূতি অনেক সময় অসম্ভবকেও সম্ভব করে তোলে।
আজ সেই ২০ দিনের শিশুকন্যা সুস্থ। মায়ের কোলেই নিরাপদে রয়েছে সে। আর সেই দৃশ্য দেখেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে গোটা সেভনি গ্রাম।


