বিশ্বকাপ মানেই রঙিন জার্সি, বড় স্পনসর, ঝাঁ-চকচকে প্রস্তুতি। কিন্তু সেই পরিচিত ছবির ঠিক উল্টো দিকটায় দাঁড়িয়ে এখন স্কটল্যান্ড ক্রিকেট। নেই স্পনসর, নেই আলাদা বিশ্বকাপ জার্সি, হাতে সময় মাত্র কয়েক দিন। তবু আচমকা পাওয়া সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায় না স্কটিশরা। প্রশ্ন একটাই—সব গুছিয়ে সময়মতো বিশ্বকাপে নামতে পারবে তো তারা?
ঠিক দুই সপ্তাহ আগে স্কটল্যান্ডকে সরকারিভাবে বিশ্বকাপে খেলার আমন্ত্রণ জানায় আইসিসি। এমন আমন্ত্রণ সাধারণত আসে দীর্ঘ পরিকল্পনা আর প্রস্তুতির পর। কিন্তু স্কটল্যান্ডের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন। ভারতের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে হাতে সময় মাত্র সাত দিন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বকাপ সংক্রান্ত সব আয়োজন সম্পন্ন করতে হচ্ছে স্কটল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডকে।
বাছাই পর্বে তাদের পারফরম্যান্স খুব একটা উজ্জ্বল ছিল না। ইটালির মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের কাছেও হারতে হয়েছে। এমনকি জার্সি নামের কম পরিচিত দলও পয়েন্ট টেবিলে স্কটল্যান্ডের উপরে ছিল। বাস্তবতা এমনই ছিল যে বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবনাচিন্তাই বন্ধ করে দিয়েছিল স্কটিশ বোর্ড। অথচ ভাগ্যের ফেরে হঠাৎ করেই সামনে এসে দাঁড়াল বিশ্বমঞ্চে খেলার সুবর্ণ সুযোগ।
বাছাই পর্বে সুযোগ না পাওয়ায় স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি কার্যত থেমে গিয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল না, বাজেট ছিল না, স্পনসরও ছিল না। এখন আচমকা আমন্ত্রণ পেয়ে যেন দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছেন বোর্ডের কর্তারা।
স্কটল্যান্ডে ক্রিকেট খুব জনপ্রিয় খেলা নয়। ফুটবল আর রাগবির ছায়ায় ক্রিকেট সেখানে অনেকটাই পিছিয়ে। তার উপর স্কটল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের পরিকাঠামোও ছোট। মাত্র তিরিশ জনের মতো কর্মকর্তা পুরো বোর্ড চালান। একসঙ্গে একাধিক দল বিদেশ সফরে গেলে চাপটা আরও বেড়ে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল। স্কটল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৯ দল এখন যুব বিশ্বকাপে ব্যস্ত। মহিলা দল নেপালে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্ব খেলছে। এর মধ্যেই আচমকা পুরুষ দলের জন্য বিশ্বকাপের ডাক। সীমিত জনবল আর সীমিত অর্থ নিয়ে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগনা সামলানো যে কতটা কঠিন, তা সহজেই বোঝা যায়।
এই কারণেই মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্পনসর। বিশ্বকাপ মানের স্পনসর জোগাড় করা এমনিতেই সময়সাপেক্ষ কাজ। সেখানে হাতে মাত্র কয়েক দিন থাকলে কাজটা প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি।
স্পনসরের পাশাপাশি বড় প্রশ্ন জার্সি। বিশ্বকাপ মানেই নতুন ডিজাইনের জার্সি, যেখানে স্পনসরের লোগো থাকে। কিন্তু স্পনসর না থাকলে জার্সির কাজও আটকে যায়। স্কটল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের চিফ এক্সিকিউটিভ ট্রুডি লিন্ডব্লেড স্পষ্টভাবেই বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, এত কম সময়ের মধ্যে যদি বিশ্বকাপের জন্য আলাদা জার্সি পাওয়া যায়, সেটাই হবে বাড়তি পাওনা। নাহলে স্কটল্যান্ড সারা বছর যে জার্সি পরে খেলে, সেই জার্সি পরেই বিশ্বকাপে নামতে হবে। স্পনসর পাওয়া যাবে কিনা, সেটাও এখন বড় প্রশ্ন।
হাতে মাত্র সাত দিন। এই সময়ের মধ্যে স্পনসর খোঁজা, জার্সি বানানো, ভ্রমণ পরিকল্পনা, লজিস্টিকস—সব কিছু সামলানো যে কতটা কঠিন, তা বোর্ডের কর্তারা নিজেরাই বুঝতে পারছেন। বাস্তবতা হল, অন্য দেশগুলোর মতো ঝকঝকে প্রস্তুতি নিয়ে হয়তো স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপে আসতে পারবে না।
তবু তারা হাল ছাড়ছে না। কারণ সুযোগটা সহজে আসে না। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো এই সুযোগ লুফে নিতে চায় স্কটিশরা।
প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলেও মাঠের পারফরম্যান্সে স্কটল্যান্ডকে কখনওই হালকাভাবে নেওয়া যায় না। ইউরোপের ক্রিকেট সার্কিটে তারা ইতিমধ্যেই সমীহ আদায় করেছে। আইসিসির অ্যাসোসিয়েট সদস্য হয়েও বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে একাধিকবার নজরকাড়া পারফরম্যান্স দিয়েছে তারা।
শেষ তিনটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২৪ বিশ্বকাপে তারা হারিয়েছিল ইংল্যান্ডকে। সেই আসরে গ্রুপে তৃতীয় হয়েছিল স্কটল্যান্ড। অল্পের জন্য পরের রাউন্ডে যাওয়া হয়নি।
২০২২ বিশ্বকাপে তারা হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো শক্তিশালী দলকে। সেবারও খুব কাছাকাছি গিয়ে সুপার-১২ থেকে ছিটকে যায়। আর ২০২১ সালে তো তারা সরাসরি সুপার-১২ রাউন্ডেই জায়গা করে নিয়েছিল।
বোর্ডের প্রশাসনিক প্রস্তুতি যতই পিছিয়ে থাকুক, দলের অনুশীলনে ঘাটতি নেই। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত অনুশীলনের মধ্যেই রয়েছে স্কটল্যান্ড দল। খেলোয়াড়রা জানেন, এমন সুযোগ জীবনে বারবার আসে না। তাই ব্যক্তিগত ও দলগতভাবে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
ক্রিকেট ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, কাগজে-কলমে পিছিয়ে থাকা দলই বড় মঞ্চে চমক দিয়েছে। স্কটল্যান্ডও সেই স্বপ্ন দেখছে।
স্পনসর নেই, জার্সি নেই, প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ—সব মিলিয়ে স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ যাত্রা নিঃসন্দেহে কঠিন। কিন্তু এই সংকটই তাদের গল্পটাকে আলাদা করে তুলছে। বড় বাজেট নয়, ঝাঁ-চকচকে আয়োজন নয়—লড়াইটা হচ্ছে মানসিক শক্তি আর মাঠের পারফরম্যান্সে।
বিশ্বকাপে নামার আগে স্কটল্যান্ড হয়তো পুরোপুরি প্রস্তুত থাকবে না। কিন্তু মাঠে নামলে তারা যে কাউকে চমকে দিতে পারে, সেটা আগের বিশ্বকাপগুলোই প্রমাণ করেছে। তাই সব অনিশ্চয়তার মাঝেও ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখ থাকবে স্কটিশদের দিকেই।
শেষ পর্যন্ত স্পনসর আসে কি না, নতুন জার্সি হয় কি না—সেটা সময়ই বলবে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও লড়াই করতে স্কটল্যান্ড ক্রিকেট জানে। আর বিশ্বকাপ মানেই তো এমন অপ্রত্যাশিত গল্পের মঞ্চ।


