আজকের দিনে গুগল ছাড়া জীবন কল্পনাই করা যায় না। সকালে ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা বারবার গুগলের ওপর ভরসা করি। কোথাও যেতে হলে ম্যাপ, কিছু জানতে হলে সার্চ, মেইল পাঠাতে জিমেল, সময় কাটাতে ইউটিউব। সবকিছু যেন এক জায়গায়। সুবিধা আছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে আছে একটা বড় প্রশ্ন। আপনি কি জানেন, গুগল আপনার কোন কোন ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে?
বেশিরভাগ মানুষই বিষয়টা গভীরভাবে ভাবেন না। কারণ আমরা ধরে নিই, বড় কোম্পানি মানেই নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবটা একটু আলাদা। আপনি প্রতিদিন যা যা করেন, তার অনেকটাই গুগলের কাছে রেকর্ড হয়ে যায়। ভালো খবর হলো, আপনি চাইলে নিজেই সেটা দেখতে পারেন। আর চাইলে নিয়ন্ত্রণেও রাখতে পারেন।
চলুন, একদম সহজ করে পুরো বিষয়টা বুঝে নেওয়া যাক।
কেন গুগল আমাদের তথ্য সংগ্রহ করে?
গুগল মূলত আপনার অভিজ্ঞতা ভালো করার জন্য তথ্য সংগ্রহ করে। ধরুন, আপনি নিয়মিত বিরিয়ানি খোঁজেন। তখন গুগল আপনাকে কাছাকাছি বিরিয়ানি রেস্টুরেন্ট দেখাবে। আবার আপনি যে ভাষায় সার্চ করেন, ভবিষ্যতে সেই ভাষাতেই ফলাফল দেখাবে।
শুনতে ভালো লাগলেও, এখানেই সমস্যা। কারণ আপনি না চাইলেও অনেক তথ্য জমা হতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা বিশাল ডেটায় পরিণত হয়।
গুগল আপনার কোন কোন তথ্য জানে?
এই জায়গাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানেই মানুষ সবচেয়ে বেশি অবাক হয়।
প্রথমেই আসে আপনার লোকেশন। ফোনে লোকেশন অন থাকলে গুগল বুঝে ফেলে আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কতক্ষণ থাকছেন, কখন বের হচ্ছেন। এমনকি আপনি প্রতিদিন কোন রুটে অফিস যান, সেটাও।
এরপর আসে সার্চ হিস্ট্রি। আপনি গুগলে যা কিছু খোঁজেন, তা সেভ হয়ে থাকে। সেটা হতে পারে কোনো রোগের নাম, কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন, কিংবা নিছক কৌতূহল।
ইউটিউবেও একই ব্যাপার। আপনি কোন ভিডিও দেখছেন, কতক্ষণ দেখছেন, কোন ধরনের ভিডিও বেশি পছন্দ করছেন, সবই নোট করা হয়।
অনেকে আবার ভয়েস সার্চ ব্যবহার করেন। “ওকে গুগল” বলে কথা বললেই কাজ হয়। কিন্তু এখানেও একটা বিষয় আছে। আপনার কণ্ঠস্বরের নমুনা, কথা বলার ধরন, সবকিছুই গুগলের কাছে জমা হতে পারে।
এছাড়া আপনি কোন অ্যাপ ব্যবহার করছেন, কতক্ষণ করছেন, কোন সময় বেশি করছেন, সেটাও অনেক সময় রেকর্ড হয়।
কীভাবে বুঝবেন গুগলের কাছে আপনার কী কী তথ্য আছে?
এটা শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ গুগল নিজেই আপনাকে এই তথ্য দেখার সুযোগ দেয়।
আপনাকে প্রথমে ফোনের সেটিংসে যেতে হবে। সেখানে গুগল অপশনে ট্যাপ করুন। এরপর “ম্যানেজ ইওর গুগল অ্যাকাউন্ট” এ যান।
সেখানে গেলে “ডেটা অ্যান্ড প্রাইভেসি” নামে একটা সেকশন পাবেন। এই জায়গাটাই আসল।
এখানে ঢুকলেই আপনি দেখতে পাবেন, আপনার ওয়েব অ্যাক্টিভিটি, অ্যাপ ব্যবহার, লোকেশন হিস্ট্রি, ইউটিউব হিস্ট্রি—সবকিছু আলাদা আলাদা করে দেখানো আছে।
আরও ভালোভাবে দেখতে চাইলে প্রতিটি ক্যাটাগরিতে ঢুকে বিস্তারিত চেক করতে পারবেন। কোন দিন কোথায় গিয়েছেন, কোন সময় কী সার্চ করেছেন, সব কিছু পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।
অনেকেই প্রথমবার এটা দেখে একটু অস্বস্তি বোধ করেন। কারণ তখন বোঝা যায়, গুগল আসলে আমাদের সম্পর্কে কতটা জানে।
কেন এটা জানা জরুরি?
কারণ তথ্য মানেই শক্তি। আপনার তথ্য যদি অন্যের হাতে থাকে, তাহলে তারা আপনার অভ্যাস বুঝতে পারে। সেই অনুযায়ী বিজ্ঞাপন দেখাতে পারে। কখনো কখনো ভুল হাতেও তথ্য চলে যেতে পারে।
আপনি হয়তো ভাবছেন, “আমার তো লুকানোর কিছু নেই।” কিন্তু ব্যাপারটা লুকানোর না। ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণের।
আপনি যদি জানেন কোন তথ্য কোথায় যাচ্ছে, তাহলে আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কোনটা দেবেন, কোনটা দেবেন না।
কীভাবে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখবেন?
এখানে আসল কাজটা শুরু।
প্রথমত, লোকেশন সবসময় অন রাখার দরকার নেই। ধরুন, আপনি বাসায় বসে আছেন। তখন লোকেশন অন রেখে কী লাভ? প্রয়োজন হলে অন করুন, কাজ শেষ হলে অফ করে দিন।
দ্বিতীয়ত, অটো-ডিলিট অপশনটা খুব কাজে দেয়। গুগল আপনাকে সুযোগ দেয় ৩ মাস, ১৮ মাস বা ৩৬ মাস পর পর পুরোনো ডেটা নিজে থেকেই মুছে দেওয়ার। এটা অন করে রাখলে অনেক ঝামেলা কমে যায়।
তৃতীয়ত, অ্যাড পার্সোনালাইজেশন বন্ধ করতে পারেন। এতে গুগল আপনার সার্চ অনুযায়ী বিজ্ঞাপন দেখাতে পারবে না। ইউটিউবে বা অন্য অ্যাপে কম টার্গেটেড অ্যাড দেখবেন।
চতুর্থত, ভয়েস কমান্ড যদি খুব দরকার না হয়, বন্ধ রাখতে পারেন। এতে আপনার কণ্ঠস্বর সংক্রান্ত ডেটা জমা হবে না।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অ্যাপ পারমিশন। অনেক অ্যাপই অপ্রয়োজনীয় পারমিশন চায়। যেমন টর্চ অ্যাপ লোকেশন চাইছে। এসব ক্ষেত্রে সাবধান থাকুন।
প্রযুক্তি ব্যবহার করুন, কিন্তু সচেতন হয়ে
প্রযুক্তি খারাপ নয়। গুগলও শত্রু নয়। তারা আমাদের জীবন সহজ করেছে, এটা সত্যি। কিন্তু চোখ বন্ধ করে সব অনুমতি দিয়ে দেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ না।
একটু সময় নিয়ে সেটিংস ঘেঁটে দেখলেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। ঠিক যেমন আপনি ঘরের দরজা রাতে বন্ধ করেন, তেমনি ডিজিটাল জীবনেও কিছু দরজা বন্ধ রাখা দরকার।
আজ একটু সময় বের করে নিজের গুগল অ্যাকাউন্টটা চেক করুন। দেখুন কী কী তথ্য আছে। যেগুলো দরকার নেই, মুছে দিন। যেগুলো ভবিষ্যতে না চাইলে সেটিংস বদলে দিন।
নিজের তথ্য নিজের হাতেই থাকুক। সেটাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।


