Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগুগল এআইজিনের ভবিষ্যৎ পড়বে এআই! গুগ্‌লের AlphaGenome বদলে দেবে রোগ নির্ণয়

জিনের ভবিষ্যৎ পড়বে এআই! গুগ্‌লের AlphaGenome বদলে দেবে রোগ নির্ণয়

Share

কল্পনা করুন, আপনার শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভবিষ্যৎ রোগের ইঙ্গিত যদি আগেই জানা যায়। ক্যানসার, বিরল জিনগত ব্যাধি কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে ছড়িয়ে পড়া অসুখ— সবকিছুর আভাস মিলছে আগে থেকেই। এই অসম্ভব মনে হওয়া ভাবনাকেই বাস্তবের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গুগ্‌লের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ‘আলফাজিনোম’। জিনের নাড়ি-নক্ষত্র বিশ্লেষণ করে রোগের ঝুঁকি বুঝে নেওয়ার যে স্বপ্ন বিজ্ঞানীরা এত দিন দেখেছেন, সেটাকেই বাস্তবে রূপ দিতে চলেছে এই এআই টুল।

মানবদেহে লক্ষ লক্ষ জিন একসঙ্গে কাজ করে। প্রতিটি জিনের নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে, আবার সামান্য বদলই বড় রোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। এত বিপুল সংখ্যক জিনের মধ্যে কোনটি কী করছে, কোথায় পরিবর্তন হচ্ছে, সেটা মানুষের পক্ষে একা বিশ্লেষণ করা প্রায় অসম্ভব। এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বড় ভরসা। এআই খুব অল্প সময়ে বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। আলফাজিনোম সেই ক্ষমতাকেই কাজে লাগিয়ে জিনগত তথ্য পড়তে ও বুঝতে পারছে অনেক বেশি নির্ভুলভাবে।

আলফাজিনোম হল গুগ্‌লের ডিপমাইন্ড বিভাগের তৈরি এক অত্যাধুনিক এআই টুল। এটি লক্ষ লক্ষ জেনেটিক কোড একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। মানুষের ডিএনএ-তে কোন জিনে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, কোথায় মিউটেশন ঘটছে, আর সেই বদল ভবিষ্যতে কী ধরনের রোগ ডেকে আনতে পারে— এসব তথ্য খুব দ্রুত তুলে ধরতে পারে এই প্রযুক্তি।

সহজভাবে বললে, যেমন একজন জ্যোতিষী জন্মকুণ্ডলি দেখে ভবিষ্যৎ বলার চেষ্টা করেন, ঠিক তেমনই আলফাজিনোম জিনের কোষ্ঠী বিচার করে রোগের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ দেখায়। তবে এখানে অনুমানের জায়গায় রয়েছে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং নির্ভরযোগ্য ডেটা।

ক্যানসার বা জটিল জিনগত রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল দেরিতে ধরা পড়া। অনেক সময় লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই শরীরের ভেতরে রোগের বীজ রোপণ হয়ে যায়। আলফাজিনোম সেই জায়গাতেই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কোন জিনের রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে, তা আগে থেকেই চিহ্নিত করতে পারলে চিকিৎসা অনেক সহজ হয়।

এছাড়া বিরল জিনগত রোগ, যেগুলোর সঠিক কারণ এত দিন অজানা ছিল, সেগুলোর পেছনের জিনগত ইতিহাসও তুলে ধরতে পারে এই এআই। ফলে রোগ নির্ণয় যেমন দ্রুত হবে, তেমনই সঠিক চিকিৎসার পথও খুলে যাবে।

ডিপমাইন্ডের প্রথম বড় সাফল্য ছিল ‘আলফামিসেন্স’। সেই টুলের কাজ ছিল জিনের জটিল তথ্যকে সহজ ভাষায় ডিকোড করা। অর্থাৎ, জিনের ভাষাকে মানুষের বোঝার মতো করে তুলে ধরা। আলফাজিনোম সেই প্রযুক্তিরই আরও উন্নত সংস্করণ। এখানে শুধু তথ্য অনুবাদ নয়, বরং গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি চিহ্নিত করাই মূল লক্ষ্য।

গুগ্‌লের দাবি, আলফাজিনোম একসঙ্গে ১০ লক্ষেরও বেশি জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করতে পারে। এত বিশাল ক্ষমতা আগে কোনও প্রযুক্তির ছিল না।

মানুষের ডিএনএ-র মাত্র ২ শতাংশ প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেয়। বাকি ৯৮ শতাংশ দীর্ঘ দিন ধরে ‘জাঙ্ক ডিএনএ’ বা ‘ডার্ক ম্যাটার’ নামে পরিচিত। এই অংশের কাজ কী, তা বিজ্ঞানীদের বড় অংশের কাছেই অজানা ছিল। অথচ গবেষণা বলছে, এই অজানা অংশেই লুকিয়ে রয়েছে বহু জটিল রোগের সূত্র।

আলফাজিনোম এই ডার্ক ম্যাটার বিশ্লেষণ করে দেখাতে পারে কোন অংশ কীভাবে কাজ করছে। কোন জিন ভবিষ্যতে সমস্যার কারণ হতে পারে, কিংবা কোন পরিবর্তন শরীরের জন্য বিপজ্জনক— এই তথ্যগুলো সামনে আসতে শুরু করেছে।

এই প্রযুক্তির আরেকটি বড় সুবিধা হল ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা। অর্থাৎ, একেক জনের জিনের গঠন আলাদা। সেই অনুযায়ী একেক জনের শরীরে ওষুধের প্রভাবও আলাদা হয়। আলফাজিনোম জিন বিশ্লেষণ করে জানাতে পারে কোন শরীরে কোন ওষুধ সবচেয়ে কার্যকর হবে, আর কোথায় কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

ক্যানসারের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যানসার কোষের জেনেটিক পরিবর্তন বুঝে নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করা গেলে চিকিৎসা আরও সফল হতে পারে।

আলফাজিনোম শুধু বর্তমান রোগ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঝুঁকিও বিশ্লেষণ করতে পারে। শরীরে এমন কোনও জিন আছে কি না, যেখান থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে দুরারোগ্য ব্যাধি ছড়িয়ে পড়তে পারে, সেটাও এই এআই শনাক্ত করতে সক্ষম। ফলে আগাম সতর্কতা নেওয়া সম্ভব হবে।

গবেষকদের মতে, যদি এই প্রযুক্তি পুরোপুরি সফল হয়, তবে বহু মারণ ও বিরল রোগের চিকিৎসায় বড় সাফল্য আসতে পারে। নতুন ওষুধ আবিষ্কার, উন্নত থেরাপি এবং আরও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতির পথ খুলে যাবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন যুগের সূচনা হতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আলফাজিনোম শুধু একটি এআই টুল নয়, বরং ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিশারি। জিনের অজানা ভাষা পড়ে রোগের আগাম ইঙ্গিত দেওয়ার ক্ষমতা চিকিৎসা জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চলেছে। ক্যানসার থেকে বিরল জিনগত রোগ— সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানুষের হাতে এবার আরও শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দিল গুগ্‌ল। সামনে দিনগুলোয় এই প্রযুক্তি কতটা জীবন বদলাতে পারে, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন