ভোলার দক্ষিণ উপকূলের বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল ঢালচরে হঠাৎ আঘাত হানা এক কালবৈশাখী ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে অসংখ্য বাড়িঘর। প্রবল ঝড়ের তাণ্ডবে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছপালা।
ঈদুল ফিতরের মাত্র কয়েক দিন আগে এই দুর্যোগে অন্তত অর্ধশতাধিক পরিবার চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যে সময়টা হওয়ার কথা ছিল উৎসবের প্রস্তুতি আর আনন্দের, সেই সময়টাতেই তারা এখন আশ্রয়, খাবার আর নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, আকস্মিক এই কালবৈশাখী ঝড় তাদের জীবনে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। মুহূর্তের মধ্যেই ঝড়ের দাপটে ভেঙে পড়ে কাঁচা ঘরবাড়ি, উড়ে যায় টিনের চালা, আর রাতের অন্ধকারে অনেক পরিবারকে ছুটতে হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।
মঙ্গলবার সকালে ঢালচর এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন নিজেদের ভাঙা ঘরবাড়ি মেরামতের কাজে ব্যস্ত। অনেকেই ভাঙা টিন জোড়া লাগাচ্ছেন, কেউবা গাছ সরিয়ে বসতঘর পরিষ্কার করছেন।
ঢালচরের বাসিন্দা মফিজ নামের এক জেলে নিজের ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে জানান, ঝড়ের সময় একটি বড় গাছ ভেঙে তার ঘরের ওপর পড়ে। এতে মুহূর্তেই ঘরের টিনের চালা ভেঙে যায়। এখন তিনি ভাঙা টিন মেরামত করে আবার থাকার মতো করার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, তার পরিবারের ছয়জন সদস্য এখন প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ঝড়ের রাতেই তারা ঘর ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হন। সেহরির সময়ও তারা প্রতিবেশীর বাড়িতেই কাটিয়েছেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি তাদের খোঁজ নিতে আসেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঢালচরের অনেক পরিবারেরই একই রকম অভিজ্ঞতা। ঝড়ের কারণে তাদের ঈদের সব প্রস্তুতি একেবারে থমকে গেছে। নতুন কাপড় কেনা, ঘর সাজানো কিংবা ঈদের রান্নার পরিকল্পনা—সবকিছুই এখন দূরের কথা।
স্থানীয় বাসিন্দা সামছুল আলম বলেন, “ঈদের আগে সবাই ঘরবাড়ি পরিষ্কার করছিল, বাজার করছিল। কিন্তু হঠাৎ ঝড়ে সব শেষ হয়ে গেল। এখন ঘরই নেই, ঈদের আনন্দ করব কীভাবে?”
তার মতো অনেকেই জানান, ঝড়ের কারণে শুধু ঘরবাড়িই নয়, নষ্ট হয়ে গেছে খাদ্যসামগ্রী, আসবাবপত্র এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক জিনিস। অনেক পরিবার এখনো ঠিকমতো খাবারও জোগাড় করতে পারছে না।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত প্রায় ২টার দিকে হঠাৎ করেই আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায়। প্রথমে হালকা বাতাস বইতে শুরু করে। কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যেই সেই বাতাস ভয়াবহ ঝড়ে রূপ নেয়।
ঝড়ের সঙ্গে শুরু হয় গুঁড়িগুঁড়ি শিলা বৃষ্টি। বাতাসের গতি এতটাই তীব্র ছিল যে টিনের চালা উড়ে যায় এবং কাঁচা ঘরবাড়ি মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। রাতের অন্ধকারে আতঙ্কিত মানুষজন নিজেদের জীবন বাঁচাতে ঘর ছেড়ে বাইরে বের হয়ে নিরাপদ জায়গা খুঁজতে থাকেন।
অনেক পরিবার ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে দৌড়ে আশ্রয় নেন প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের বাড়িতে। কেউ কেউ আবার খোলা মাঠ বা তুলনামূলক মজবুত ঘরে গিয়ে রাত কাটান।
ঢালচর ইউনিয়নের বেশিরভাগ মানুষই দরিদ্র জেলে বা কৃষক পরিবার। তাদের অনেকেই কাঁচা ঘরে বসবাস করেন। ফলে প্রবল ঝড়ের আঘাত তারা সহ্য করতে পারেননি।
ঝড়ের কারণে বহু ঘরের দেয়াল ভেঙে পড়েছে, টিনের চালা উড়ে গেছে এবং ভেতরের আসবাবপত্র সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও রান্নাঘর ও গোয়ালঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, যদি ঘরগুলো পাকা হতো, তাহলে হয়তো এত বড় ক্ষতি হতো না। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে অনেকেই এখনো কাঁচা ঘরেই বসবাস করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢালচর নয়, চরফ্যাশন উপজেলার আরও কয়েকটি চরাঞ্চলেও ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢালচর, কুকরি মুকরি, চর পাতিলা, চর নিজাম, চর ফারুকি, চর মানিকা এবং নজরুল নগরসহ কয়েকটি অঞ্চল। এসব এলাকায় অন্তত অর্ধশতাধিক বাড়িঘর আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের ধারণা, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। কারণ বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল হওয়ায় অনেক জায়গার তথ্য এখনো পুরোপুরি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন দ্রুত সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তাদের অনেকেই এখনো খোলা আকাশের নিচে বা অন্যের ঘরে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও বন কর্মকর্তা মুইনুল জানান, হঠাৎ আঘাত হানা এই ঝড়ে ঢালচরেই প্রায় ত্রিশটি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি ইতিমধ্যে উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকা তৈরি শেষ হলে প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এমাদুল হোসেন জানিয়েছেন, ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে তাদের প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
তার মতে, সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হবে যাতে তারা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
ঢালচরের অনেক পরিবারের জন্য এবার ঈদুল ফিতর যেন আনন্দের নয়, বরং দুঃখের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝড়ে ঘর হারানো মানুষজন এখন নতুন করে জীবন গড়ার চিন্তায় ব্যস্ত।
তবু অনেকেই আশা ছাড়ছেন না। স্থানীয়রা বলছেন, যদি দ্রুত সরকারি সহায়তা পাওয়া যায়, তাহলে হয়তো তারা আবার ঘর মেরামত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
ঈদের আগে এই দুর্যোগ তাদের জীবনে বড় আঘাত হয়ে এলেও তারা আশা করছেন—সহায়তার হাত বাড়ালে আবারও হাসি ফিরবে ঢালচরের মানুষের মুখে।


