চোখের সামনে হঠাৎ হঠাৎ সাদা বিন্দু ভেসে ওঠে। কখনও মনে হয় আকাশ ভরা ঝিকিমিকি তারা চোখের ভেতর ঢুকে পড়েছে। আবার কখনও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের সামনে ফুটে ওঠে অচেনা মুখ। টিভি দেখার পর চোখ সরালেও সেই দৃশ্যটা যেন ছায়ার মতো লেগে থাকে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এই অভিজ্ঞতা অনেকের দৈনন্দিন বাস্তব। এই সমস্যার নাম ভিস্যুয়াল স্নো সিনড্রোম।
এই রোগে দৃষ্টি পুরোপুরি চলে যায় না। কিন্তু চোখে দেখা জগৎটা অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। সব সময় মনে হয় চোখের সামনে কিছু একটা চলছে। ফলে মাথা ধরে যায়, মন অস্থির হয়, আর স্বাভাবিক জীবনটাই কঠিন হয়ে পড়ে।
ভিস্যুয়াল স্নো সিনড্রোম কী
ভিস্যুয়াল স্নো সিনড্রোমকে অনেকেই চোখের রোগ ভাবেন। আসলে বিষয়টা শুধু চোখে আটকে নেই। এটি মূলত স্নায়বিক সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মস্তিষ্কের ভেতরে সংকেত আদানপ্রদানে গোলমাল হলেই এই রোগ দেখা দিতে পারে।
আমাদের চোখ যা দেখে, সেই তথ্য স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। সেখানে তথ্যগুলো ঠিকঠাক প্রক্রিয়াকরণ হওয়ার কথা। কিন্তু যখন এই যোগাযোগে বাধা আসে, তখন বাস্তব দৃশ্যের সঙ্গে কাল্পনিক দৃশ্য মিশে যায়। তখনই চোখের সামনে ভাসে সাদা দানা, আলো, ছায়া কিংবা মুখ।
বিশেষ করে মস্তিষ্কের কর্টেক্স ও হাইপোথ্যালামাসের মধ্যে যোগাযোগে সমস্যা হলে ভিস্যুয়াল স্নো সিনড্রোমের ঝুঁকি বাড়ে।
চোখের সামনে কী কী অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখা যায়
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম। তবে কিছু লক্ষণ খুব সাধারণ।
অনেকে বলেন, চোখের সামনে সারাক্ষণ টিভির পর্দায় নোইজের মতো সাদা দানা নড়াচড়া করে। আবার কারও চোখে ভেসে বেড়ায় ছোট পোকা বা সুতো। অনেকেই আলো সহ্য করতে পারেন না। উজ্জ্বল আলো দেখলেই চোখে ঝলক লাগে, মাথা ধরে যায়।
কেউ কেউ জানান, দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখের সামনে কাল্পনিক মুখ ভেসে ওঠে। রাতের বেলা বা কম আলোতে দেখতে সমস্যা হয়। এসবের সঙ্গে যোগ হয় তীব্র মাথা যন্ত্রণা।
প্যালিনোপসিয়া কী এবং কেন হয়
ভিস্যুয়াল স্নো সিনড্রোমের একটি বড় লক্ষণ হলো প্যালিনোপসিয়া। সহজ ভাষায় বললে, কোনও জিনিস দেখার পর চোখ সরালেও সেই জিনিসটা চোখে লেগে থাকে।
ধরুন, আপনি মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ফোন নামানোর পরেও স্ক্রিনের ছাপটা চোখের সামনে ভাসছে। স্বাভাবিকভাবে কয়েক সেকেন্ডে এটা মিলিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এই রোগে সেই ছাপ অনেকক্ষণ থেকে যায়।
ফ্লোটার: চোখের সামনে ভেসে বেড়ানো ছায়া
অনেকেই অভিযোগ করেন, চোখের সামনে সব সময় ছোট ছোট দাগ বা পোকা উড়ছে বলে মনে হয়। এগুলোকে বলা হয় ফ্লোটার। আলোয় বা সাদা দেয়ালের দিকে তাকালে এগুলো বেশি চোখে পড়ে।
ভিস্যুয়াল স্নো সিনড্রোমে এই ফ্লোটার আরও বেশি বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। ফলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
ফোটোফোবিয়া ও আলোতে অস্বস্তি
এই রোগে আলোর প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা তৈরি হয়। একে বলা হয় ফোটোফোবিয়া। রোদ, টিউবলাইট কিংবা মোবাইলের আলো—সবই চোখে কষ্ট দেয়।
অনেকে বলেন, আলো নিভিয়ে দিলেও চোখের সামনে সাদা বিন্দু ঘোরাফেরা করে। এর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় তীব্র মাথা যন্ত্রণা। অনেক সময় চোখ বন্ধ করলেও আরাম মেলে না।
রাতে দেখতে সমস্যা এবং নেক্ট্যালোপিয়া
ভিস্যুয়াল স্নো সিনড্রোমে আক্রান্ত অনেকেরই রাতে দেখতে সমস্যা হয়। কম আলোতে চোখ ঠিকভাবে মানিয়ে নিতে পারে না। অন্ধকারে ছায়া, আলো কিংবা মুখের মতো আকৃতি ভেসে ওঠে। এতে ভয় এবং উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ ও টিনিটাসের সম্পর্ক
এই রোগ শুধু চোখে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কানে অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়। একে বলা হয় টিনিটাস।
কেউ বলেন, সারাক্ষণ কানে শঙ্খ বা ঘণ্টার মতো শব্দ বাজছে। কেউ আবার মনে করেন দূরে বজ্রপাত হচ্ছে। কারও কারও কানে ফিসফিস আওয়াজ শোনার অনুভূতি হয়। এই সব মিলিয়ে মানসিক চাপ অনেক বেড়ে যায়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন
ভিস্যুয়াল স্নো সিনড্রোম সাধারণত কমবয়সি মানুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। যাঁদের মাইগ্রেন আছে, তাঁদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
বারবার অ্যাংজাইটি অ্যাটাক হলে, দীর্ঘদিন উদ্বেগ বা অবসাদের ওষুধ খেলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। মাথায় দুর্ঘটনাজনিত আঘাত পেলেও পরে এই রোগ ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
ভিস্যুয়াল স্নো সিনড্রোম কি সারানো যায়
এখনও পর্যন্ত এই রোগের কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়।
নিউরো-অপটোমেট্রিক রিহ্যাবিলিটেশন থেরাপির মাধ্যমে চোখ ও মস্তিষ্কের সমন্বয় উন্নত করার চেষ্টা করেন চিকিৎসকেরা। মাইগ্রেন থাকলে তার জন্য আলাদা ওষুধ দেওয়া হয়।
মানসিক চাপ কমানো খুব জরুরি। তাই ধ্যান, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ও নিয়মিত ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত ক্যাফিন, এনার্জি ড্রিংক বা উত্তেজক পানীয় এড়িয়ে চলতে বলা হয়।
আধুনিক গবেষণা ও ভবিষ্যৎ আশা
বিশ্বের নানা দেশে ভিস্যুয়াল স্নো সিনড্রোম নিয়ে গবেষণা চলছে। আধুনিক নিউরো-ইমেজিং পদ্ধতিতে চুম্বক ও রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে মস্তিষ্কের ভেতরের কার্যকলাপ বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই গবেষণার লক্ষ্য হলো, মস্তিষ্কের ঠিক কোন অংশে সমস্যা হচ্ছে তা চিহ্নিত করা। ভবিষ্যতে সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে আরও কার্যকর চিকিৎসা বেরিয়ে আসবে বলেই আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শেষ কথা
ভিস্যুয়াল স্নো সিনড্রোম বিরল হলেও একেবারে অবহেলার রোগ নয়। চোখের সামনে অদ্ভুত কিছু দেখলে বা কানে অস্বাভাবিক শব্দ শুনলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সঠিক চিকিৎসা, মানসিক যত্ন আর সচেতন জীবনযাপন অনেকটাই স্বস্তি দিতে পারে। সমস্যা বোঝা গেলে, লড়াই করাটাও সহজ হয়ে যায়।

