Homeনির্বাচনজামায়াতের ইশতেহারে কী আছে? যুবক, অর্থনীতি, নির্বাচন ও জুলাই বিপ্লব একসাথে

জামায়াতের ইশতেহারে কী আছে? যুবক, অর্থনীতি, নির্বাচন ও জুলাই বিপ্লব একসাথে

Share

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী ইশতেহার মানে শুধু প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়, বরং একটি দলের রাষ্ট্রভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জনগণের বাস্তবতা, সময়ের চাহিদা ও আগামীর সম্ভাবনাকে সামনে রেখে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। “নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার” নামের এই দলিলটিতে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দর্শন থেকে শুরু করে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও গণতন্ত্র—সবকিছুই গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

ইশতেহারের কাঠামো ও মূল দর্শন

জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারকে আটটি বৃহৎ ভাগে সাজিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়া। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে তারা আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের কথা বলেছে। একই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন, আধুনিক অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর অগ্রগতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও রয়েছে।

এই ইশতেহারকে দলীয় কর্মসূচির সীমায় আটকে না রেখে জাতির প্রতি একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। জনগণের মতামত ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি হওয়ায় এটিকে একটি “জীবন্ত দলিল” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে দলটি।

২৬টি অগ্রাধিকার: রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা

জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।

প্রথমত, ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠাকে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, যুবকদের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরির কথাও ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অপরাধমুক্ত নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সৎ নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার রয়েছে।

অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আর্থিক সংস্কার

ইশতেহারের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি। প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পখাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং সব ধরনের বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকিংসহ সামগ্রিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব, স্বচ্ছ ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গণতন্ত্র, নির্বাচন ও মানবাধিকার

গণতন্ত্রের প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামী সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন, সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ এবং শক্তিশালী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, এর মাধ্যমেই একটি কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত করা সম্ভব।

বিগত সময়ে সংঘটিত খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত।

কৃষি, পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তা

কৃষিকে অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে ইশতেহারে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কৃষকদের সহায়তা জোরদার করে একটি কৃষি বিপ্লব ঘটানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০২৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ‘তিন শূন্য ভিশন’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবেশগত অবক্ষয় শূন্যে নামানো, বর্জ্য শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকি শূন্যে নামানোর মাধ্যমে একটি সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার কথা বলা হয়েছে।

শিল্পায়ন, শ্রমিক অধিকার ও প্রবাসী কল্যাণ

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি বড় পরিসরে শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনমান উন্নয়ন, নিরাপদ ও মানসম্মত কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও রয়েছে।

প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব অধিকার নিশ্চিত করা এবং দেশ গঠনে তাদের বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা

সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা এবং আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নত চিকিৎসা সেবাকে ধীরে ধীরে বিনামূল্যে করার কথাও বলা হয়েছে।

সার্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ কর্মজীবন ও আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে।

১০টি মৌলিক প্রতিশ্রুতি: হ্যাঁ ও না

ইশতেহারে ১০টি মৌলিক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে পাঁচটি ‘হ্যাঁ’ এবং পাঁচটি ‘না’ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘হ্যাঁ’-এর মধ্যে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ‘না’-এর তালিকায় রয়েছে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি।

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা

“চলো সবাই একসাথে গড়ি বাংলাদেশ”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী একটি নিরাপদ, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ার রূপরেখা তুলে ধরেছে। ইশতেহার প্রণয়নে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পেশার ২৫০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়ার দাবি করে দলটি বলছে, এটি কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে, এই নির্বাচনী ইশতেহার জামায়াতে ইসলামী কী ধরনের বাংলাদেশ কল্পনা করে, তার একটি বিস্তৃত ও সুসংহত চিত্র তুলে ধরে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন