Homeনির্বাচনআ’লীগ নেই মাঠে, ভোট যাবে কার ঝুলিতে? মণিরামপুরে জমে উঠছে নির্বাচনী সমীকরণ

আ’লীগ নেই মাঠে, ভোট যাবে কার ঝুলিতে? মণিরামপুরে জমে উঠছে নির্বাচনী সমীকরণ

Share

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যশোর-৫ (মণিরামপুর) সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ নেতৃত্বের দখলে থাকা এই আসনে এবার দলটির সরাসরি অনুপস্থিতি একটি রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।

নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই শূন্যতার সুযোগ নিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোট ব্যাংককে নিজেদের পক্ষে নেওয়ার লক্ষ্যে নীরব ও প্রকাশ্য নানা কৌশল অবলম্বন করছেন।

নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ ভোটার তালিকা অনুযায়ী, যশোর-৫ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৭৪ হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটার প্রায় ৭৪ হাজার ৫৩৬ জন। উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই ভোটারদের একটি বড় অংশ ভবদহ ও আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে কেন্দ্রীভূত। প্রশাসনিকভাবে এই অঞ্চলগুলোকে নির্বাচনকালীন সময় ‘সংবেদনশীল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে অতীতে ভোটের সময় নিরাপত্তা জোরদার করতে হয়েছে।

মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে ১২৮টি কেন্দ্রে ৭৯০টি কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে। পুরুষ কক্ষ ৩৭৯টি। মহিলা কক্ষ ৪১১টি। এরমধ্যে নির্বাচনী নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করে আলাদা নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ও আস্থার বিষয়টি নির্বাচন কমিশন বিশেষভাবে নজরে রেখেছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার শুধু সংখ্যালঘু ভোটারই নয়, আওয়ামী লীগের নীরব সমর্থকরাও একটি বড় ফ্যাক্টর। আওয়ামী লীগ সরাসরি নির্বাচনে না থাকায় দলটির সাধারণ সমর্থকরা প্রার্থীভেদে ভোট দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রশাসনিক সূত্র বলছে, এই শ্রেণির ভোটারদের আচরণ পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন, যা নির্বাচনী ফলাফলের অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে যশোর-৫ আসনে ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচন কমিশনের প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী, ধর্মভিত্তিক দল, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মাঠে বহুমুখী প্রতিযোগিতা চলছে। প্রশাসনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রার্থীদের প্রচারণায় সরাসরি দলীয় রাজনীতির চেয়ে স্থানীয় উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও ভবদহ সমস্যার মতো বিষয় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই আসনের নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের পর থেকে অধিকাংশ নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। তবে নির্বাচন কমিশনের সংরক্ষিত ফলাফলের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ২০০১ সালে ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার প্রার্থীরা বিজয়ী হন। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিজয় প্রশাসনের নথিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা এবারের নির্বাচনী কৌশলেও প্রভাব ফেলছে।

ভবদহ অঞ্চলকে ঘিরে প্রশাসনের উদ্বেগ এবারও স্পষ্ট। উপজেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত সংকট ভবদহ এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে রাজনৈতিক অনাস্থা তৈরি করেছে।

মতুয়া সম্প্রদায়ের স্থানীয় নেতারা প্রশাসনের বিভিন্ন সভায় নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি তুলে ধরেছেন। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় এসব এলাকায় ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন ও পর্যবেক্ষণ জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি প্রশাসনিকভাবেও নজরে এসেছে।

উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, একই রাজনৈতিক ধারার দুই প্রার্থীর উপস্থিতির কারণে কিছু এলাকায় উত্তেজনার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণে দলীয় কার্যালয়, প্রচারণা এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অন্যদিকে ধানের শীষের প্রার্থী পক্ষের নেতারা প্রশাসনকে জানিয়েছেন, তারা শান্তিপূর্ণ প্রচারণা ও ভোটগ্রহণে সহযোগিতা করবেন। প্রশাসনের দাবি, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি, তবে শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি পাল্টাতে পারে বলে সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে।

দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক বিভিন্ন সভায় সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা ও সমান অধিকারের কথা তুলে ধরছেন। উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, প্রার্থীদের এসব বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতির বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধির আলোকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যশোর-৫ আসনে মোট ১২৮টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৭৪ হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৪৮০ জন এবং নারী ভোটার সংখ্যাও প্রায় সমান (১লাখ ৮৫ হাজার ৭৬৮ জন)। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।

সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন ও উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন হলো, যশোর-৫ আসনের নির্বাচন এবার একাধিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে।

আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক কোন দিকে ঝুঁকবে, সংখ্যালঘু ও মতুয়া ভোটারদের আস্থা কে অর্জন করতে পারবেন এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন মাঠে কী প্রভাব ফেলবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে মণিরামপুরের নির্বাচনী ফলাফল।

বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে এই আসনে একটি তীব্র ও ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন