Homeবিশ্ব সংবাদমিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্ট মিন অং লাইং: গণতন্ত্র না সামরিক চালাকি?

মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্ট মিন অং লাইং: গণতন্ত্র না সামরিক চালাকি?

Share

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা জেনারেল মিন অং লাইং এখন দেশের রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন। তবে এটি কি সত্যিই বেসামরিক শাসনে প্রত্যাবর্তন, নাকি সামরিক ক্ষমতারই নতুন রূপ—এই প্রশ্ন এখন সবার মনে।

সামরিক অভ্যুত্থান থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথ

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন মিন অং লাইং। তখন তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এক বছরের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে দেশকে আবার বেসামরিক শাসনে ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে লেগে যায় পাঁচ বছর।

এখন যে সংসদ তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচন করতে যাচ্ছে, সেটি মূলত তার অনুগতদের দিয়ে গঠিত। ফলে অনেকেই মনে করছেন, এটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক নির্বাচন নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি আনুষ্ঠানিকতা।

নতুন সরকারে সামরিক প্রভাব

মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর জন্য সংসদের এক-চতুর্থাংশ আসন সংরক্ষিত থাকে। পাশাপাশি সামরিক সমর্থিত দল ইউএসডিপি নির্বাচনে ব্যাপক জয় পাওয়ায় সংসদে তাদের প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়েছে।

নতুন সরকারেও সামরিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বেও আসছেন মিন অং লাইং-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি ইউনিফর্ম ছাড়লেও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ছাড়ছেন না।

গৃহযুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়

অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমার কার্যত গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পুরো দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে।

বিশেষ করে সামরিক বাহিনী “চার আঘাত” কৌশল ব্যবহার করে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সমর্থনভিত্তি ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। এতে গ্রামাঞ্চলে নির্বিচারে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে স্কুল, হাসপাতাল ও ঘরবাড়ি।

সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্ভোগ

যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। একদিকে নিরাপত্তাহীনতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে জীবন এখন চরম দুর্বিষহ।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ঘরছাড়া।

একজন মোটরবাইক চালকের কথায়, “আগে আর এখন এই পার্থক্যটা দিন-রাতের মতো। এখন আয় দিয়ে খরচ চালানোই কঠিন।”

জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক ধস

মিয়ানমারের অর্থনীতি এখন এক কঠিন সময় পার করছে। জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছে।

দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি আমদানি করতে হয়। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এখন সেই সরবরাহও কমে গেছে। ফলে পেট্রোল-ডিজেলের রেশনিং শুরু হয়েছে, দামও বেড়ে গেছে অনেক।

বিদ্যুতের সংকটও তীব্র। অনেক এলাকায় দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রতিরোধ আন্দোলন ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা

সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অসংখ্য প্রতিরোধ গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। তারা এখনো প্রায় ৯০টি শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

অন্যদিকে, অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী ন্যাশনাল ইউনিটি গভার্নমেন্ট (NUG) নতুন সরকারকে পুরোপুরি অবৈধ বলে মনে করে।

তাদের দাবি, সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে একটি নতুন ফেডারেল সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।

সমঝোতার সম্ভাবনা কি আছে?

এই সংকটের মধ্যে কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, সমঝোতার পথ খোঁজা এখন জরুরি। তবে বাস্তবতা হলো—দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়।

একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক কর্মীর মতে, “এই নির্বাচন কোনো সমাধান নয়। জনগণ ক্লান্ত। যদি দ্রুত কোনো সমাধান না আসে, দেশ পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।”

অনেকে মনে করেন, সাবেক নেত্রী অং সান সূচিকে মুক্তি দিলে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। যদিও এখনো এটি শুধু গুঞ্জন হিসেবেই রয়েছে।

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

সবকিছু মিলিয়ে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। সামরিক শাসন, গৃহযুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট সবকিছু একসাথে দেশটিকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে।

মিন অং লাইং রাষ্ট্রপতি হলেও, তার শাসন পদ্ধতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে—এমন আশা খুব কম মানুষই করছেন।

বাস্তবতা হলো, ইউনিফর্ম খুলে ফেললেও ক্ষমতার ধরন বদলায়নি। আর যতদিন এই পরিস্থিতি চলবে, ততদিন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও কমবে না।

শেষ কথা যদি সহজ করে বলি মিয়ানমার এখন এমন একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে ছোট একটা ভুল সিদ্ধান্তও পুরো দেশকে আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন