বিশ্বকাপ মানেই উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা আর চাপের মধ্যে পারফর্ম করার পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় পাকিস্তান দল বরাবরই নাটকীয়তা উপহার দেয়। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচটিও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
কাগজে-কলমে সহজ মনে হওয়া একটি ম্যাচ শেষ পর্যন্ত কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়। তবুও শেষ হাসি হেসেছে পাকিস্তান। ১৪৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করে তারা জয় পেয়েছে ৩ উইকেটে, তবে এই জয় স্বস্তির চেয়ে বেশি প্রশ্নই তুলেছে।
নেদারল্যান্ডস আগে ব্যাট করে ১৪৭ রানে অলআউট হয়ে যায়। লক্ষ্যটা খুব বড় ছিল না। পিচও ছিল ব্যাটিংয়ের জন্য অনুকূল। এমন অবস্থায় অনেকেই ভেবেছিলেন পাকিস্তান সহজেই ম্যাচ জিতে নেবে। কিন্তু মাঠের খেলায় যে সবসময় হিসাব মেলে না, সেটাই আবার প্রমাণ হলো।
১৪৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভালোই করেছিল পাকিস্তান। ওপেনাররা আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলতে থাকেন। কিন্তু মাঝপথে হঠাৎ উইকেট পড়তে শুরু করতেই চাপে পড়ে যায় পুরো দল। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনায় গিয়ে দাঁড়ায়।
কলম্বোর মাঠে টস জিতে পাকিস্তানের অধিনায়ক সলমন আলি আঘা প্রথমে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেন। শুরু থেকেই সাহসী মানসিকতা নিয়ে ব্যাট করতে নামে নেদারল্যান্ডস। তারা বড় দলের বিপক্ষে খেললেও ভয় পায়নি।
মাইকেল লেভিট আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন। ম্যাক্স ও’দুদ বড় রান করতে না পারলেও দলের শুরুটা ভালো করে দেন। এরপর বাস ডে লিড ও স্কট এডওয়ার্ডস ইনিংস গুছিয়ে নেন। তারা পাকিস্তানের পেস ও স্পিন আক্রমণের সামনে দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলছিলেন।
কিছু সময়ের জন্য মনে হচ্ছিল, নেদারল্যান্ডস বড় স্কোরের দিকে এগোচ্ছে। তবে অভিজ্ঞতার অভাব তাদের বড় সংগ্রহ গড়তে দেয়নি। ভালো শুরু পেলেও সেটাকে বড় রানে পরিণত করতে পারেনি ডাচ ব্যাটাররা।
মাঝের ওভারে এসে ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেয় পাকিস্তানের স্পিন বোলিং। আবরার আহমেদ ও সাইম আয়ুব চমৎকার বোলিং করেন। আবরার ২৩ রানে ২ উইকেট নেন এবং সাইম মাত্র ৭ রানে তুলে নেন ২ উইকেট। এই দুই স্পিনার নেদারল্যান্ডসের ব্যাটিং লাইনআপে ধাক্কা দেন।
এর সঙ্গে পাকিস্তানের ফিল্ডিংও ছিল দারুণ। বাউন্ডারি লাইনে বাবর আজম ও শাহিন শাহ আফ্রিদির কয়েকটি ক্যাচ ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে কঠিন পরিস্থিতিতে নেওয়া সেই ক্যাচগুলো ম্যাচের গতি বদলে দেয়।
শেষ পর্যন্ত ১৪৭ রানে গুটিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। লক্ষ্যটা ছোট হওয়ায় পাকিস্তানের জন্য ম্যাচটি সহজ হওয়ারই কথা ছিল।
ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন সাহিবজাদা ফারহান। তিনি ৩১ বলে ৪৭ রান করেন। তাঁর ইনিংসে ছিল চারটি চার ও দুটি ছক্কা। শুরুতেই দলের ভিত মজবুত করে দেন তিনি।
সাইম আয়ুবও ২৪ রান করে তাকে ভালো সঙ্গ দেন। তখন মনে হচ্ছিল, ম্যাচটি একতরফা হয়ে যাবে। দর্শকরাও ভাবছিলেন পাকিস্তান খুব দ্রুত জয় পেয়ে যাবে।
কিন্তু ক্রিকেটে সব সময় গল্প একরকম থাকে না। নেদারল্যান্ডসের বোলার আরিয়ান দত্ত হঠাৎ ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন উত্তেজনা। তিনি প্রথমে সাইম আয়ুবকে আউট করেন। এরপর দ্রুত আরেকটি উইকেট তুলে নেন।
এই দুটি উইকেট পড়তেই হঠাৎ চাপ বেড়ে যায় পাকিস্তানের ওপর। ব্যাটারদের পায়ে যেন কাঁপুনি ধরে। রান তোলার গতি কমে যায়। বাবর আজম ধীরগতিতে খেলতে গিয়ে আউট হন। এরপর একে একে ফিরে যান উসমান খান, শাদাব খান ও মহম্মদ নওয়াজ।
হঠাৎ করেই ম্যাচে ফিরে আসে নেদারল্যান্ডস। তাদের বোলার লোগান ভ্যান বিক ও পল ভ্যান মিকেরেন টানা আক্রমণ চালাতে থাকেন। পাকিস্তানের ডাগআউটে তখন স্পষ্ট অস্থিরতা।
যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে, তখন সামনে আসেন ফাহিম আশরাফ। তিনি মাত্র ১১ বলে ২৯ রানের একটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন। চাপের মধ্যে এমন আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
১৯তম ওভারে ভ্যান বিকের বলেই তিনি ১৯ রান তুলে নেন। এই ওভারটাই ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। একই সঙ্গে ওই ওভারে ফাহিমের একটি সহজ ক্যাচ মিস করেন ম্যাক্স ও’দুদ। সেই মুহূর্তেই যেন ম্যাচ নেদারল্যান্ডসের হাত থেকে বেরিয়ে যায়।
পরের ওভারের শুরুতেই বাকি কাজ শেষ করে দেন ফাহিম। পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত ৩ উইকেটে জয় তুলে নেয়।
জয় পেলেও পাকিস্তানের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে এতটা চাপে পড়া ভালো লক্ষণ নয়। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এমন অনিশ্চয়তা দলের জন্য ঝুঁকির।
নেদারল্যান্ডসের মতো তুলনামূলক দুর্বল দলের বিপক্ষেই যদি এতটা লড়াই করতে হয়, তাহলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কী হবে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই ম্যাচে হেরে গেলেও নেদারল্যান্ডসের লড়াই সবার নজর কেড়েছে। তারা বড় দলের সামনে মাথা নত করেনি। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—তিন ক্ষেত্রেই তারা নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
বিশেষ করে তাদের বোলাররা ছোট স্কোর নিয়েও যেভাবে ম্যাচে ফিরে এসেছে, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। কয়েকটি মুহূর্তে তারা ম্যাচ জয়ের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।
পাকিস্তান দলের একটা পুরনো অভ্যাস আছে। সহজ ম্যাচকে নিজেরাই কঠিন করে তোলে। এই ম্যাচেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব এবং মাঝের ওভারে চাপ সামলাতে না পারা তাদের জন্য বড় চিন্তার কারণ।
বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এমন ভুলগুলো দ্রুত ঠিক না করলে সামনে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে তারা।
ম্যাচের স্কোরবোর্ডে হয়তো শুধু একটি জয় লেখা থাকবে। কিন্তু এই জয়ের পেছনের গল্প অনেক বেশি নাটকীয়। নেদারল্যান্ডস সাহসী ক্রিকেট খেলেছে, পাকিস্তান জিতেছে লড়াই করে। তবে এই ম্যাচে পাকিস্তান যেমন স্বস্তি পেয়েছে, তেমনি সতর্ক হওয়ার বার্তাও পেয়েছে।
বিশ্বকাপের পথটা দীর্ঘ। সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। এই জয় যদি তাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় লাভ। আর যদি পুরনো সমস্যাগুলো ঠিক না হয়, তাহলে সহজ ম্যাচকে কঠিন করে তোলার গল্প আরও অনেকবার শুনতে হতে পারে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

