দেশের আবহাওয়া নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটির সর্বশেষ দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসের শেষ ভাগে দেশে তীব্র তাপপ্রবাহের পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বজ্রবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি এবং কালবৈশাখী ঝড়ের আশঙ্কাও রয়েছে। এই পূর্বাভাস সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি উৎপাদন, নৌযান চলাচল এবং উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিন মাসের একটি দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে। এতে জানানো হয়েছে, এই সময়ে দেশের সামগ্রিক বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকতে পারে। তবে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ গরমের তীব্রতা এবার একটু আগেই অনুভূত হতে পারে এবং তা দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম জানান, জলবায়ুর সাম্প্রতিক পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার আচরণে কিছুটা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাব হিসেবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি এবং সাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে।
ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বিশেষ করে দেশের নদী অববাহিকা এলাকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা দেখা দিতে পারে। অন্য অঞ্চলগুলোতে হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই কুয়াশা সড়ক, নৌ ও বিমান যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। ভোরের দিকে যানবাহন চলাচলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রেও কুয়াশার প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে শীতকালীন ফসলের ক্ষেত্রে।
এপ্রিল মাসের শেষার্ধে বঙ্গোপসাগরে ২ থেকে ৩টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত একটি লঘুচাপ নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এই সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলে উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া, ভারী বৃষ্টি এবং জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বাড়বে। এতে মাছ ধরার নৌকা, সমুদ্রগামী জাহাজ এবং উপকূলবর্তী মানুষের জীবন ও সম্পদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি ও সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে চার থেকে আট দিন বজ্রবৃষ্টি, বজ্রপাত এবং শিলাবৃষ্টিসহ কালবৈশাখী ঝড় হতে পারে। সাধারণত গ্রীষ্মের শুরুতেই এই ধরনের ঝড় দেখা যায়, তবে এবার এর তীব্রতা কিছুটা বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কালবৈশাখী ঝড়ের সময় আকস্মিক দমকা হাওয়া, বিদ্যুৎ চমকানো বজ্রপাত এবং অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে ফসলের ক্ষতি, গাছপালা উপড়ে পড়া এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
এপ্রিলের শেষার্ধে দেশে একাধিক দফায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে তিন থেকে পাঁচটি মৃদু তাপপ্রবাহ, কয়েকটি মাঝারি তাপপ্রবাহ এবং এক থেকে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ হতে পারে।
মৃদু তাপপ্রবাহে তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। মাঝারি তাপপ্রবাহে তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। আর তীব্র তাপপ্রবাহে তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষদের জন্য এই সময়টা বিশেষভাবে সতর্ক থাকার।
একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় ও কালবৈশাখী ঝড়ের সম্ভাবনা থাকায় বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে শহর ও গ্রাম উভয় এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়ার এই পরিবর্তন কৃষি খাতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তীব্র গরমে জমির আর্দ্রতা কমে যেতে পারে, যা ফসল উৎপাদনের জন্য ক্ষতিকর। আবার হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে মাঠের ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় হলে চিংড়ি ঘের, মাছের খামার এবং লবণ চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়মিত পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। উপকূলীয় এলাকার মানুষকে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। কৃষকদেরও ফসল রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
শহরাঞ্চলে তাপপ্রবাহের সময় পর্যাপ্ত পানি পান, রোদ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা এড়িয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

