তুষারঝড়ের ভয়াল রাতে হঠাৎ বিকট শব্দ। যেন কোথাও কিছু ফেটে গেল। আশপাশের মানুষ আঁতকে উঠছেন। শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, বিস্ফোরণটা আসছে গাছ থেকেই। গাছের গুঁড়ি ফেটে যাচ্ছে। অনেকেই জীবনে প্রথমবার এমন দৃশ্য দেখছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—গাছে আবার বিস্ফোরণ হয় নাকি?
এই অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি এলাকায়, যেখানে ভয়াবহ তুষারঝড় আর প্রচণ্ড ঠান্ডা জনজীবন কার্যত স্তব্ধ করে দিয়েছে। তাপমাত্রা নেমে গেছে শূন্যের অনেক নিচে। সেই অসহনীয় ঠান্ডার মধ্যেই নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে “গাছে বিস্ফোরণ”।
প্রথমে শুনলে বিষয়টা অবিশ্বাস্যই লাগে। গাছে তো কোনো বিস্ফোরক নেই। তাহলে এমন বিকট শব্দ কেন? কেন হঠাৎ গাছের গুঁড়ি ফেটে যাচ্ছে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, একে বিস্ফোরণ বলা হলেও আসলে এটি কোনো বিস্ফোরণ নয়। এটি একটি প্রাকৃতিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, যার নাম “ফ্রস্ট ক্র্যাকস”।
সাধারণ মানুষের কাছে শব্দটা অপরিচিত। কিন্তু শীতপ্রধান দেশগুলোতে এই ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে এবারের তুষারঝড় এতটাই তীব্র যে ঘটনাটি চোখে পড়ছে বেশি, আর শব্দ হচ্ছে আরও জোরে।
ফ্রস্ট ক্র্যাকস বলতে বোঝায় গাছের গুঁড়িতে হঠাৎ করে ফাটল ধরা। এই ফাটল ধরার সময়ই মূলত বিকট শব্দ শোনা যায়। দূর থেকে শুনলে মনে হয় যেন কোনো কিছু বিস্ফোরিত হলো।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন কোনো অঞ্চলে তাপমাত্রা খুব অল্প সময়ের মধ্যে হঠাৎ অনেক নিচে নেমে যায়, তখন গাছ সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায় না। গাছের ভেতরে যে জল ও রস থাকে, তা আচমকা ঠান্ডায় দ্রুত জমে যায়।
জলের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—জমে গেলে তার আয়তন বেড়ে যায়। গাছের গুঁড়ির ভেতরের জল যখন বরফে পরিণত হয়, তখন সেই জল ফুলে ওঠে। কিন্তু গাছের শক্ত কাঠামো সেই বাড়তি চাপ সহ্য করতে পারে না।
ফলাফল হিসেবে গাছের গুঁড়ির ভেতরে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। এক পর্যায়ে সেই চাপ বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। তখনই গাছের বাকল ও ভেতরের কাঠে ফাটল ধরে। সেই মুহূর্তেই হয় বিকট শব্দ। মানুষ সেটাকেই বিস্ফোরণ বলে মনে করছেন।
এটা সব সময় বা সব জায়গায় হয় না। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, গাছের বয়স, প্রজাতি, ভেতরের আর্দ্রতার পরিমাণ এবং তাপমাত্রা কমার গতি—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যেসব গাছে ভেতরে বেশি জল বা রস থাকে, সেগুলোতে ফ্রস্ট ক্র্যাকস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আবার যদি তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমে, তাহলে গাছ মানিয়ে নেওয়ার সময় পায়। কিন্তু তাপমাত্রা যদি হঠাৎ করে খুব দ্রুত নেমে যায়, তখন বিপদ বাড়ে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে অংশগুলোতে এই ঘটনা ঘটছে, সেখানে তুষারঝড়ের সঙ্গে এসেছে চরম ঠান্ডা হাওয়া। অনেক জায়গায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাপমাত্রা অনেক ডিগ্রি কমে গেছে।
এই আকস্মিক পরিবর্তনই মূল সমস্যা। দীর্ঘ সময় ধরে ঠান্ডা থাকলে গাছ ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নেয়। কিন্তু ঝড়ের সময় হঠাৎ তাপমাত্রা পড়ে গেলে গাছের ভেতরের জল দ্রুত বরফে পরিণত হয়। তখনই ফ্রস্ট ক্র্যাকস দেখা দেয়।
অনেকে বলছেন, মাঝরাতে এমন শব্দ শুনে মনে হয়েছে যেন বন্দুকের গুলি বা বোমা ফাটার আওয়াজ। এর কারণ হলো, গাছের কাঠ খুব শক্ত। সেই শক্ত কাঠ যখন হঠাৎ ফেটে যায়, তখন ভেতরের চাপ একসঙ্গে বেরিয়ে আসে। এতে শব্দটা হয় খুব তীক্ষ্ণ ও জোরালো।
নিরিবিলি তুষারঢাকা পরিবেশে এই শব্দ আরও বেশি প্রতিধ্বনিত হয়। ফলে মানুষের কাছে তা আরও ভয়ংকর মনে হয়।
সাধারণভাবে ফ্রস্ট ক্র্যাকস মানুষের জন্য সরাসরি বিপজ্জনক নয়। তবে বড় গাছের ডাল ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে তুষারঝড়ের সময় বাইরে থাকলে বা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, প্রচণ্ড ঠান্ডা ও তুষারঝড়ের সময় বড় গাছের কাছাকাছি না থাকাই ভালো। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমে।
অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই ধরনের ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে। আগে শীত ধীরে ধীরে আসত। এখন অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, হঠাৎ করেই তাপমাত্রা চরমভাবে নেমে যাচ্ছে।
এই আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তন গাছপালার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ফলে ফ্রস্ট ক্র্যাকসের মতো ঘটনা আরও বেশি চোখে পড়ছে।
যদিও ঘটনাটি ভয়ংকর মনে হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা এটিকে প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলেই ব্যাখ্যা করছেন। বহু বছর ধরেই শীতপ্রধান অঞ্চলে এই ঘটনা ঘটে আসছে। শুধু এবার সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি বেশি আলোচনায় এসেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, গাছ ফেটে যাওয়ার মানে এই নয় যে গাছ মারা যাবে। অনেক গাছ এই ফাটল নিয়েই বেঁচে থাকে এবং পরবর্তী সময়ে নিজেকে আবার সামলে নেয়।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যদি তাপমাত্রার এই আকস্মিক ওঠানামা বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও দেখা যেতে পারে। তবে এটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বরং বিষয়টি বুঝে সতর্ক থাকাই যথেষ্ট।
তুষারঝড়ের মধ্যে গাছে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনে ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এটি কোনো রহস্যময় বা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটি প্রকৃতিরই একটি প্রতিক্রিয়া, যেখানে হঠাৎ ঠান্ডার চাপ সামলাতে না পেরে গাছ ফেটে যায়।
অতএব, পরের বার তীব্র শীতের রাতে এমন কোনো শব্দ কানে এলে মনে রাখবেন—ওটা কোনো বিস্ফোরণ নয়। প্রকৃতি নিজের ভাষায় আমাদের কিছু একটা জানাচ্ছে মাত্র।

