অ্যাপল বরাবরই তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল নিয়ে খুব হিসেব করে কথা বলে। বিশেষ করে Siri নিয়ে। অতীতে একাধিকবার অ্যাপলের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, Siri কখনও চ্যাটবট হবে না। কিন্তু প্রযুক্তি দুনিয়ায় গুজব থেমে থাকে না। নতুন একটি রিপোর্ট দাবি করছে, iOS 27-এর সঙ্গে সঙ্গে Siri-র চরিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। অনেকটাই চ্যাটবটের মতো হয়ে উঠতে পারে অ্যাপলের এই ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট।
সম্প্রতি জানা যায়, অ্যাপল অভ্যন্তরীণভাবে দুটি এআই চ্যাটবট প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এই খবর প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, শরৎকালেই Siri একটি পূর্ণাঙ্গ চ্যাটবট ইন্টারফেসে রূপ নিতে পারে। এই তথ্য সরাসরি অ্যাপলের মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট গ্রেগ জোসউইকের আগের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গ্রেগ জোসউইক আগে জানিয়েছিলেন, অ্যাপল চ্যাটবটকে কখনও Siri-র অংশ বানাবে না। বরং আলাদা কোনো অ্যাপ অভিজ্ঞতা হিসেবেই চ্যাটবট তৈরি করা হবে। কিন্তু নতুন গুজব বলছে, অ্যাপল সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে পারে।
ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপল Siri-কে এমনভাবে উন্নত করছে যাতে এটি ChatGPT-এর মতো কথোপকথনমূলক অভিজ্ঞতা দিতে পারে। এই নতুন Siri নাকি প্রথমবারের মতো উন্মোচিত হবে WWDC 2026-এ। এরপর iOS 27, iPadOS 27 এবং macOS 27-এর সঙ্গে এটি ব্যবহারকারীদের হাতে পৌঁছাবে।
এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য একটাই—ব্যবহারকারীর সঙ্গে আরও স্বাভাবিক, দীর্ঘ এবং স্মার্ট কথোপকথন। শুধু প্রশ্নের উত্তর নয়, আগের কথাবার্তা মনে রেখে পরের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে Siri-র।
রিপোর্ট অনুযায়ী, অ্যাপল অভ্যন্তরীণভাবে একটি আলাদা Siri অ্যাপ নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে। এই প্রকল্পের কোডনাম দেওয়া হয়েছে “Campos”। তবে অ্যাপল এটি আলাদা কোনো অ্যাপ হিসেবে গ্রাহকদের দেবে না।
ব্যবহারকারীরা আগের মতোই “Hey Siri” বলেই সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। পার্থক্য হবে ভিতরের অভিজ্ঞতায়। অর্থাৎ Siri থাকবে আগের জায়গাতেই, কিন্তু তার বুদ্ধিমত্তা ও কথোপকথনের ধরন হবে অনেক বেশি চ্যাটবটের মতো।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—এটিকে আদৌ চ্যাটবট বলা যায় কি না। সাধারণ চ্যাটবট মানে একটি নির্দিষ্ট ইন্টারফেস, যেখানে গিয়ে ব্যবহারকারী টানা কথোপকথন চালাতে পারেন। অ্যাপল সেই ধরনের আলাদা কেন্দ্রীয় চ্যাটবট অভিজ্ঞতা দিচ্ছে না।
তবে কার্যকারিতার দিক থেকে Siri অনেকটাই চ্যাটবটের কাছাকাছি যাবে। কথোপকথনের মেমোরি রাখা, আগের নির্দেশ মনে রাখা এবং প্রসঙ্গ বুঝে উত্তর দেওয়া—এসবই যোগ হচ্ছে।
এই নতুন Siri তৈরি হচ্ছে অ্যাপলের App Intents সিস্টেমের ওপর ভিত্তি করে। সহজ ভাষায় বললে, App Intents হলো এমন একটি মানচিত্র, যার মাধ্যমে AI আপনার আইফোনের বিভিন্ন অ্যাপ, ফিচার এবং ডেটার সঙ্গে কাজ করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মেমোরি ক্ষমতা। অর্থাৎ Siri শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থেমে যাবে না। আপনার আগের ইন্টারঅ্যাকশন মনে রেখে পরবর্তী কাজ আরও ভালোভাবে করতে পারবে।
সবচেয়ে বড় চমক হতে পারে Google Gemini-এর সঙ্গে অ্যাপলের অংশীদারিত্ব। রিপোর্ট অনুযায়ী, অ্যাপলের নিজস্ব Foundation Model আপগ্রেড করা হচ্ছে Gemini দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে।
এর মানে দাঁড়াচ্ছে, Siri পাবে আরও শক্তিশালী ভাষা বোঝার ক্ষমতা, উন্নত যুক্তি বিশ্লেষণ এবং প্রাসঙ্গিক উত্তর দেওয়ার দক্ষতা। এই সমন্বয় অ্যাপল ব্যবহারকারীদের এমন এক অভিজ্ঞতা দিতে পারে, যা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে সহজে পাওয়া যাবে না।
শক্তিশালী AI ব্যাকএন্ড, অন-ডিভাইস টুলস, App Intents এবং মেমোরি—এই চারটি জিনিস একসঙ্গে কাজ করলে iPhone, iPad, Mac এবং Apple Vision Pro কার্যত AI-প্রথম ডিভাইসে পরিণত হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এখানে LLM বা বড় ভাষা মডেলে অ্যাক্সেস থাকবে ব্যক্তিগত, স্থানীয় এবং নিরাপদভাবে। ডেটা সবসময় ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
যখন কোনো কাজ ডিভাইসে সম্ভব হবে না, তখন Apple-এর Private Cloud Compute সার্ভারে ডেটা পাঠানো হবে। কিন্তু অ্যাপলের দাবি, সেখানে ব্যবহারকারীর ডেটা ঠিক একইভাবে সুরক্ষিত থাকবে যেমনটি ডিভাইসে থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি দিক—এই সার্ভারগুলো নবায়নযোগ্য শক্তিতে চলে। ফলে প্রতিটি AI অনুরোধ পরিবেশের ওপর কম প্রভাব ফেলে।
Apple Intelligence মূলত ২০২6 সালে আসার কথা থাকলেও তা বিলম্বিত হয়। এই বিলম্ব অ্যাপলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব ও AI কৌশল নিয়ে অনেক জল্পনা তৈরি করেছিল।
তবে অনেকের মতে, এই বিলম্বই অ্যাপলকে সঠিক পথে এনেছে। কারণ এর ফলেই Google Gemini অংশীদারিত্ব সম্ভব হয়েছে।
এখনও পর্যন্ত iOS 26.4-এ নতুন Apple Intelligence পুরোপুরি চালু হয়নি। WWDC এখনও কিছুটা দূরে। এই সময়ের মধ্যেই Google, OpenAI বা অন্য কোনো কোম্পানি নতুন কিছু এনে অ্যাপলকে আবার পিছনে ফেলে দিতে পারে।
তবুও অ্যাপল ধীর কিন্তু হিসেবি কৌশলে এগোচ্ছে। তারা এমন একটি AI দিতে চায়, যা ব্যবহারকারীর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না, নজরদারি করবে না, কিন্তু প্রয়োজন হলে নিঃশব্দে কাজ করবে।
সাম্প্রতিক সময়ে AI শিল্প কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছে। চ্যাটবটগুলোতে বিজ্ঞাপন বাড়ছে, অনেক ব্যবহারকারী বিরক্ত হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ বলছে, AI বুদবুদ হয়তো শিগগিরই ফেটে যাবে।
এই প্রেক্ষাপটে অ্যাপলের দেরিতে আসা হয়তো তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।
সবকিছু মিলিয়ে ২০২৬ সাল অ্যাপলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। Siri পুরোপুরি চ্যাটবট না হলেও, আগের চেয়ে অনেক বেশি স্মার্ট ও কথোপকথনক্ষম হয়ে উঠবে—এটা প্রায় নিশ্চিত।
যদি অ্যাপল তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার ভারসাম্য রাখতে পারে, তাহলে iOS 27-এর Siri শুধু একটি আপডেট নয়, বরং AI দুনিয়ায় অ্যাপলের বড় প্রত্যাবর্তনের সূচনা হতে পারে।


