Homeআবহাওয়াযশোরে ভয়াবহ শৈত্যপ্রবাহ: সূর্যহীন দিনে কুয়াশা, হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন

যশোরে ভয়াবহ শৈত্যপ্রবাহ: সূর্যহীন দিনে কুয়াশা, হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন

এই সূর্যহীন আবহাওয়ার কারণে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও খুব একটা বাড়ছে না। ১৫ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই আটকে থাকছে পারদ। তার সঙ্গে সারাদিন বইছে হিমেল হাওয়া, যা হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

Share

যশোরে শীত যেন এবার একটু বেশিই রাগী মেজাজে হাজির হয়েছে। টানা তিন দিন ধরে আকাশে সূর্যের কোনো দেখা নেই। তার ওপর গত এগার দিন ধরে চলছে অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহ। সকাল থেকে রাত—চারদিকজুড়ে কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে ভীষণ কষ্টকর। ঘর থেকে বের হলেই ঠান্ডার কামড়ে শরীর কেঁপে উঠছে, আর প্রয়োজন ছাড়া মানুষজন রাস্তায় বের হতে চাইছে না।

যশোরের তাপমাত্রা পরিস্থিতি: শীতের রেকর্ড ভাঙছে

যশোর বিমান বাহিনীর আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোরে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে আসে ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। একই দিনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল মাত্র ১৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার আগের দিন সোমবার ভোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর সর্বোচ্চ ছিল ১৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গত এগার দিন ধরেই যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ঘোরাফেরা করছে। চলতি শীত মৌসুমে ইতোমধ্যে চার দিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে এই জেলাতেই। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, শীতের তীব্রতায় যশোর এবার দেশের শীর্ষে।

সূর্যহীন দিন আর ঘন কুয়াশার দখল

গত তিন দিন ধরে যশোরের আকাশে সূর্যের আলো দেখা যায়নি। প্রতিদিন রাত নামলেই চারপাশে কুয়াশার চাদর বিছিয়ে যাচ্ছে। ভোরের দিকে কুয়াশা আরও ঘন হয়ে ওঠে, যেন চোখের সামনে কিছুই পরিষ্কার দেখা যায় না। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা কিছুটা পাতলা হলেও সূর্যের দেখা মিলছে না।

এই সূর্যহীন আবহাওয়ার কারণে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও খুব একটা বাড়ছে না। ১৫ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই আটকে থাকছে পারদ। তার সঙ্গে সারাদিন বইছে হিমেল হাওয়া, যা হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শৈত্যপ্রবাহে ব্যাহত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা

এমন পরিস্থিতিতে যশোরের জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠাই যেন এক যুদ্ধ। ঠান্ডা পানিতে হাত-মুখ ধোয়ার কথা ভাবলেই শরীর শিউরে ওঠে। অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক আর অসুস্থ মানুষদের নিয়ে পরিবারগুলো বেশ চিন্তিত।

রাস্তা-ঘাটে মানুষের চলাচল আগের তুলনায় অনেক কম। দোকানপাট খুলছে দেরিতে, আবার সন্ধ্যা নামার আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডার কারণে অনেকেই কাজে যেতে পারছেন না, ফলে দৈনিক আয়-রোজগারে টান পড়ছে।

খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি

এই শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষজন। যশোর শহরের রায়পাড়া এলাকার রিকশাচালক আব্দুর রহিম বলেন, শীতে মানুষ খুব প্রয়োজন না হলে রাস্তায় বের হয় না। স্কুল-কলেজ খোলায় কিছু যাত্রী মিলছে ঠিকই, কিন্তু প্রচণ্ড ঠান্ডায় রিকশা চালানো ভীষণ কষ্টকর হয়ে গেছে। ঠান্ডা বাতাসে হাত-পা অবশ হয়ে আসে, তখন ব্রেক ধরা বা প্যাডেল চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে।

একই কথা বললেন খড়কি এলাকার ভ্যানচালক জিয়াদ আলী। তিনি জানান, শীতের কারণে ভাড়াও আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। যেটুকু কাজ মিলছে, সেটুকু করতেও অনেক কষ্ট হচ্ছে। ঠান্ডায় শরীর শক্ত হয়ে যায়, তবু সংসারের জন্য বের হতেই হয়।

শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে

এই তীব্র শীতে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে কয়েকগুণ। ঠান্ডাজনিত সর্দি-কাশি, জ্বর আর শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়ছে। অনেক হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এই সময়ে গরম কাপড় পরা, কুসুম গরম পানি পান করা আর অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

গ্রামের দিকে এখনো অনেক পরিবার আছে, যাদের পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র নেই। রাতের ঠান্ডা তাদের জন্য আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। খোলা ঘরে বা টিনের ঘরে বসবাসকারীরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন।

আবহাওয়ার এমন আচরণের কারণ কী

আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ আর ঘন কুয়াশার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সূর্যের আলো না থাকায় দিনের তাপমাত্রা বাড়তে পারছে না। যতদিন এই অবস্থা থাকবে, ততদিন শীতের তীব্রতা কমার সম্ভাবনাও কম।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী কয়েক দিন যশোরসহ আশপাশের এলাকায় শীতের দাপট অব্যাহত থাকতে পারে। তাই সবাইকে আগে থেকেই সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

শীতে করণীয়: একটু সতর্কতাই বড় ভরসা

এই শৈত্যপ্রবাহে নিজেকে আর পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি। গরম কাপড় ব্যবহার করা, বিশেষ করে সকাল আর রাতে বাইরে বের হলে মোটা কাপড় পরা খুব দরকার। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি যত্ন নেওয়া উচিত। ঠান্ডা বাতাস থেকে বাঁচতে দরজা-জানালা বন্ধ রাখা, আর গরম খাবার খাওয়াও উপকারি।

যশোরের মানুষ আশা করছে, দ্রুতই সূর্যের দেখা মিলবে আর এই দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমবে। তবে ততদিন পর্যন্ত শীতের সঙ্গে লড়াই করেই চলতে হবে।

শেষ কথা

যশোরে চলমান শৈত্যপ্রবাহ আর সূর্যহীন দিনের প্রভাব এখন স্পষ্ট। কুয়াশা, হিমেল হাওয়া আর কম তাপমাত্রায় সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। এই পরিস্থিতিতে সচেতনতা আর পারস্পরিক সহায়তাই হতে পারে বড় ভরসা। শীত একদিন চলে যাবে, কিন্তু ততদিন পর্যন্ত সাবধান থাকাই সবচেয়ে ভালো উপায়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন