ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেট ও রাজনীতির মঞ্চে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলেছে। ভারতের এই পদক্ষেপকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ ও ‘অযৌক্তিক’ বলে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন ভারতীয় কংগ্রেস নেতা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষক শশী থারুর। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে আত্মসমালোচনার সুর—“এই লজ্জা আমরা নিজেরাই ডেকে এনেছি।”
মোস্তাফিজ বিতর্কের পটভূমি: কীভাবে শুরু হলো সংকট
২০২৬ আইপিএলের নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেয় ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে। এটি ছিল আইপিএলে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক। এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশি ক্রিকেটভক্তদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার তোলে। কিন্তু আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন সংক্রান্ত অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভারতের কিছু রাজনৈতিক মহল ও উগ্র ধর্মীয় সংগঠন মোস্তাফিজের আইপিএলে অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ধীরে ধীরে বিষয়টি ক্রিকেটের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নেয়।
শশী থারুরের বক্তব্য: “বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়”
এই প্রেক্ষাপটে শশী থারুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, এই বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্য ভারত নিজেই দায়ী। তাঁর ভাষায়, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে এক পাল্লায় মাপা যায় না।
থারুরের মতে, বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদ রপ্তানি করে না। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, আলোচনার ধরন এবং সহযোগিতার ইতিহাস পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করা রাজনৈতিকভাবে অপরিণত সিদ্ধান্ত।
বিসিসিআই ও কেকেআরের ভূমিকা
উগ্রবাদী হুমকির মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের সচিব দেবাজিৎ সাইকিয়া ঘোষণা দেন, মোস্তাফিজকে দলে না রাখতে কেকেআরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পরপরই কলকাতা নাইট রাইডার্স আনুষ্ঠানিকভাবে মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
এই সিদ্ধান্তে ক্রিকেটবিশ্বে প্রশ্ন উঠেছে—একজন পেশাদার ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত বা জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে মাঠের বাইরের রাজনৈতিক ঘটনার যোগসূত্র কতটা যুক্তিসংগত? অনেক বিশ্লেষকের মতে, এখানে খেলাধুলার চেয়ে রাজনীতিই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর প্রভাব
মোস্তাফিজ ইস্যু দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে চাপের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারত ক্রীড়া, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতায় ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আসছে। আইপিএলের মতো একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে এমন সিদ্ধান্ত সেই সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
শশী থারুরসহ ভারতের অনেক বুদ্ধিজীবী মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তে ভারত নিজেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্বস্তিকর অবস্থানে পড়েছে। খেলাধুলাকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার বানালে ভবিষ্যতে তার ফল ভালো হবে না।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও বাংলাদেশের কঠোর অবস্থান
২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করবে ভারত ও শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার কথা কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইডেন গার্ডেন্সে। গ্রুপ পর্বের একাধিক ম্যাচও নির্ধারিত ছিল ভারতের মাটিতে।
কিন্তু মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ঘোষণা দেয়, বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশ দল ভারতে গিয়ে খেলবে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-কে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
বিসিবির বিবৃতিতে বলা হয়, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এবং মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। এই অবস্থান ক্রিকেট বিশ্বে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
ক্রিকেট না রাজনীতি: প্রশ্নের মুখে আইপিএল
আইপিএল দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখানে নানা দেশের খেলোয়াড়রা রাজনীতি ও জাতীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে খেলেন—এটাই ছিল মূল দর্শন। মোস্তাফিজ ইস্যু সেই দর্শনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনার দায় কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের ওপর চাপানো হয়, তবে ভবিষ্যতে আইপিএলের মতো লিগে বিদেশি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আত্মসমালোচনার প্রয়োজন
শশী থারুরের বক্তব্য শুধু মোস্তাফিজ ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভারতের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি আত্মসমালোচনার আহ্বান। খেলাধুলা মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। সেখানে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত সেই সেতু ভেঙে দিতে পারে।
মোস্তাফিজুর রহমান একজন পেশাদার ক্রিকেটার। মাঠের পারফরম্যান্সের বাইরে গিয়ে তাঁকে বিতর্কের কেন্দ্রে টেনে আনা ক্রীড়ার মূল চেতনার সঙ্গে যায় না। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে যেন ক্রিকেট রাজনীতির বলি না হয়—সেটাই এখন দুই দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রত্যাশা।

