Homeবিশ্ব সংবাদবিয়ের আগেই শারীরিক সম্পর্ক : ইন্দোনেশিয়ায় যুগলের ১৪০ বার বেত্রাঘাত

বিয়ের আগেই শারীরিক সম্পর্ক : ইন্দোনেশিয়ায় যুগলের ১৪০ বার বেত্রাঘাত

Share

বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক ও মদ্যপানের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে এক যুগলকে প্রকাশ্যে ১৪০ বার বেত্রাঘাত করা হয়েছে। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে প্রদেশটিতে চালু থাকা কঠোর ইসলামী শরিয়া আইন। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, এই শাস্তির দৃশ্য জনসমক্ষে কার্যকর করা হয়, যা ঘিরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ওই যুগলের মধ্যে ২১ বছর বয়সী এক তরুণীকে তিনজন নারী কর্মকর্তা বেত্রাঘাত করেন। শাস্তি কার্যকরের সময় মঞ্চেই কাঁদতে কাঁদতে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠলে দ্রুত একটি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তাকে ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পুরো ঘটনাটি উপস্থিত মানুষের সামনে ঘটে, যা অনেকের কাছেই মানসিকভাবে নাড়া দেওয়ার মতো ছিল।

এই ঘটনায় শুধু ওই যুগলই নয়, একই দিনে আরও চারজনকে বেত্রাঘাত করা হয়। তাদের সবার বিরুদ্ধেই ইসলামী শরিয়া আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই চারজনের মধ্যে আচেহ প্রদেশের ইসলামিক ফোর্সের একজন সদস্যও ছিলেন। অর্থাৎ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও এই আইনের বাইরে নন—এমন বার্তাই দিতে চায় স্থানীয় প্রশাসন।

ইন্দোনেশিয়ার অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় আচেহ প্রদেশ আলাদা। এখানেই একমাত্র প্রদেশ হিসেবে পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামী শরিয়া আইন কার্যকর রয়েছে। এই আইনের অধীনে বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ককে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। প্রাদেশিক আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, কেউ বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্কে জড়ালে তাকে সর্বোচ্চ ১০০ বার বেত্রাঘাত করা হবে।

শুধু তাই নয়, মদ্যপান করাও এখানে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মদ পান করলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ৪০ বার বেত্রাঘাতের শাস্তি দেওয়া হয়। এই দুটি অপরাধ একসঙ্গে হওয়ায় সংশ্লিষ্ট যুগলকে মোট ১৪০ বার বেত্রাঘাত করা হয়েছে।

বিবিসি জানিয়েছে, গতকাল আচেহ প্রদেশের ইসলামিক ফোর্সের এক সদস্যকে ২৩ বার বেত্রাঘাত করা হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি তার নারী পার্টনারের সঙ্গে প্রাইভেট জায়গায় অন্তরঙ্গ সময় কাটাচ্ছিলেন। আচেহ’র ইসলামিক ফোর্সের প্রধান মুহাম্মদ রিজাল জানান, ওই সদস্যকে তার পার্টনারের বাড়ি থেকে আটক করা হয়।

তিনি আরও বলেন, শুধু শাস্তিই নয়, ওই সদস্যকে বাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হবে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ বোঝাতে চায়, আইন সবার জন্য সমান—পদ বা ক্ষমতা কাউকে ছাড় দেয় না।

আচেহ প্রদেশে বেত্রাঘাত সাধারণত প্রকাশ্যে করা হয়। এর পেছনে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে। স্থানীয় প্রশাসনের মতে, এই ধরনের শাস্তি অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। কেউ যেন ভবিষ্যতে শরিয়া আইন ভাঙার সাহস না পায়, সেটাই তাদের লক্ষ্য।

তবে সমালোচকরা বলছেন, প্রকাশ্যে এমন শাস্তি মানুষের মর্যাদা ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই শাস্তি মানসিক আঘাত আরও গভীর করে তোলে।

এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো আবারও আচেহ প্রদেশের শরিয়া আইন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, বেত্রাঘাত একটি নিষ্ঠুর ও অমানবিক শাস্তি। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অনেক সংগঠন মনে করে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা জীবনযাপন নিয়ে এমন কঠোর হস্তক্ষেপ আধুনিক সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার মাঝে মাঝে এই আইন নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছে, তবু আচেহ প্রদেশের বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের কারণে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না।

আচেহ প্রদেশের সব মানুষ কিন্তু এই আইনকে নেতিবাচক চোখে দেখেন না। অনেক স্থানীয় বাসিন্দা মনে করেন, এই শরিয়া আইন তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ রক্ষা করছে। তাদের মতে, সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এই কঠোরতা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ এই আইনকে সময়ের সঙ্গে বেমানান বলে মনে করে। তারা মনে করে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে রাষ্ট্রীয় শাস্তি আরোপ করা উচিত নয়।

এই ধরনের ঘটনা ইন্দোনেশিয়ার সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে—ধর্মীয় আইন ও আধুনিক মানবাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়। একদিকে দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার আবাসস্থল, অন্যদিকে এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবেও পরিচিত।

আচেহ প্রদেশে বেত্রাঘাতের ঘটনা বারবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে আসায় দেশের ভাবমূর্তি নিয়েও আলোচনা হয়। ভবিষ্যতে এই আইন সংস্কার হবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে বিয়ের আগেই শারীরিক সম্পর্কের দায়ে যুগলকে ১৪০ বার বেত্রাঘাতের ঘটনা শুধু একটি শাস্তির খবর নয়। এটি ধর্ম, আইন, মানবাধিকার এবং আধুনিক মূল্যবোধের সংঘাতের প্রতিচ্ছবি। কারও কাছে এটি ন্যায়বিচার, আবার কারও কাছে চরম নিষ্ঠুরতা। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—এই ধরনের ঘটনা বিশ্বজুড়ে বিতর্ক থামাচ্ছে না, বরং আরও জোরালো করে তুলছে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন