কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়। এ বার বাস্তবেই এমন এক প্রযুক্তি তৈরির পথে হাঁটছে মহারাষ্ট্র সরকার, যেখানে শুধু গলার স্বর, কথার ধরন আর ভাষার ভঙ্গি শুনেই নাকি চিহ্নিত করা যাবে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা নাগরিক। শুনতে অবাক লাগলেও, মুম্বই পুরসভা নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতেই এই নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI টুল তৈরির উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পে কয়েক কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তব প্রকল্প
মুম্বই পুরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি নেতৃত্বাধীন মহাজুটি জোট অনুপ্রবেশ ইস্যুকে বড় করে তুলেছিল। তাদের ইস্তেহারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, প্রযুক্তির সাহায্যে মুম্বইকে “অনুপ্রবেশমুক্ত” করা হবে। সেই সময়ই জানানো হয়, আইআইটি-র মতো নামী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা শনাক্ত করতে তৈরি হবে বিশেষ AI টুল।
ভোট মিটতেই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে প্রথম পদক্ষেপ নিল মহারাষ্ট্র সরকার। সূত্রের খবর, আইআইটি বম্বের গবেষকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি তৈরির।
কীভাবে কাজ করবে এই AI টুল?
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই AI সিস্টেম মানুষের গলার স্বর, উচ্চারণ, ভাষার টান, কথা বলার ছন্দ বিশ্লেষণ করবে। সেই তথ্যের উপর ভিত্তি করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হবে।
ধরা যাক, কেউ হিন্দি বা মারাঠি বলছেন, কিন্তু তার উচ্চারণে আলাদা একটা টান আছে। AI সেই টান বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। ঠিক যেমন মোবাইলে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট আমাদের কণ্ঠ চিনে নেয়, অনেকটা তেমনই।
প্রকল্পে খরচ কত?
এই AI টুল তৈরির জন্য রাজ্য সরকার প্রায় ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। মূল উদ্দেশ্য, নিরাপত্তা সংস্থা এবং পুলিশের কাজে সহায়তা করা। তবে প্রশাসন স্পষ্ট করেছে, এই প্রযুক্তি শুধু প্রাথমিক বাছাইয়ের কাজ করবে।
মানে, AI কাউকে চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশি ঘোষণা করবে না। AI যদি কাউকে সন্দেহজনক বলে চিহ্নিত করে, তার পর পুলিশ বা তদন্তকারী সংস্থা সেই ব্যক্তির নথি, পরিচয় এবং অন্যান্য তথ্য খতিয়ে দেখবে।
“AI বলল মানেই দোষী”—এমন নয়?
এই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে। শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর ভর করে কাউকে বিদেশি বলে সন্দেহ করা কতটা যুক্তিযুক্ত? ভাষা তো শিখে নেওয়া যায়। গলার স্বর তো বদলাতেও পারে।
ধরা যাক, কেউ বহু বছর মুম্বইয়ে থাকছেন। কাজের সূত্রে স্থানীয় ভাষার সঙ্গে তার কথাবার্তা মিশে গেছে। আবার উল্টো দিকেও হতে পারে। ভারতের অন্য রাজ্যের কেউ হয়তো এমন উচ্চারণে কথা বলেন, যা AI ভুল করে বাংলাদেশি বলে ধরে নিতে পারে।
প্রযুক্তির নির্ভুলতা নিয়ে সন্দেহ
AI প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, ভুলের সম্ভাবনা থেকেই যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধনে AI ব্যবহারের বিষয় নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক হয়েছে। অনেকের নাম ভুল করে বাদ পড়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের গরমিল ধরা পড়েছে।
সেই অভিজ্ঞতার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, মহারাষ্ট্র সরকারের এই AI টুল কতটা নির্ভুল হবে? ভুল হলে তার দায় কে নেবে? একজন নিরপরাধ মানুষকে শুধু গলার স্বরের কারণে হয়রানির শিকার হতে হবে না তো?
মানবাধিকার বনাম প্রযুক্তি
এই প্রকল্প ঘিরে মানবাধিকার কর্মীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাদের বক্তব্য, পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভাষা বা উচ্চারণকে একমাত্র মানদণ্ড করা বিপজ্জনক হতে পারে। এতে বৈষম্যের ঝুঁকি তৈরি হয়।
অনেকেই বলছেন, ভারত বহু ভাষা ও সংস্কৃতির দেশ। এখানে উচ্চারণের ভিন্নতা স্বাভাবিক। সেই বৈচিত্র্যকে সন্দেহের চোখে দেখলে সামাজিক বিভাজন আরও বাড়তে পারে।
সরকারের বক্তব্য কী?
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, এই প্রযুক্তি কাউকে শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ার হবে না। এটি শুধুমাত্র একটি সহায়ক ব্যবস্থা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সব সময়ই মানুষের হাতেই থাকবে।
সরকারি আধিকারিকদের দাবি, শহরের নিরাপত্তা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতেই এই উদ্যোগ। AI শুধু সময় বাঁচাবে এবং প্রাথমিক তথ্য জোগাড়ে সাহায্য করবে।
রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে
বিরোধী দলগুলো এই প্রকল্পকে কটাক্ষ করেছে। তাদের অভিযোগ, ভোটের রাজনীতির জন্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা বলছে, বাস্তব সমস্যার সমাধান না করে প্রতীকী পদক্ষেপে ব্যস্ত সরকার।
কেউ কেউ আবার প্রশ্ন তুলছেন, এত টাকা খরচ করে এই AI বানানোর বদলে সীমান্ত নজরদারি বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া জোরদার করা যেত কি না।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
সব মিলিয়ে, গলার স্বর শুনে বাংলাদেশি শনাক্ত করার এই AI প্রকল্প একদিকে যেমন প্রযুক্তিগতভাবে অভিনব, তেমনই সামাজিক ও আইনি দিক থেকে স্পর্শকাতর। এটি সফল হলে প্রশাসনিক কাজে নতুন দিশা খুলতে পারে। আবার ব্যর্থ হলে তৈরি হতে পারে বড় বিতর্ক।
শেষ পর্যন্ত এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হবে, আর কতটা ন্যায্য থাকবে, তা সময়ই বলবে। তবে এতটুকু নিশ্চিত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু গবেষণাগারের বিষয় নয়। রাজনীতি, প্রশাসন আর সাধারণ মানুষের জীবনেও তার প্রভাব দিন দিন বাড়ছেই।

