Homeঅর্থ-বানিজ্যসোনার দামে রেকর্ড! কেন এত বেড়েছে আর হঠাৎ কেন কমছে? জানুন ৩...

সোনার দামে রেকর্ড! কেন এত বেড়েছে আর হঠাৎ কেন কমছে? জানুন ৩ কারণ

Share

সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দামের দিকে তাকালেই চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা। বাংলাদেশ শুধু নয়, বিশ্ববাজারেও স্বর্ণের দাম একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছে। যারা নিয়মিত বাজার খোঁজ রাখেন, তারা বুঝতে পারছেন—এটা কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়। এর পেছনে আছে বেশ কিছু শক্ত কারণ। আবার সেই দামই অল্প সময়ের মধ্যে কমেও গেছে। কেন এমন হচ্ছে, সেটাই এখন সবার প্রশ্ন।

বিশ্ববাজারে সোনার দামের ঐতিহাসিক উত্থান

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলারের সীমা ছাড়িয়ে যায়। অল্প সময়ের জন্য দাম পাঁচ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছিও পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে রূপা ও প্লাটিনামের দামও বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ে সরাসরি। গত বৃহস্পতিবার প্রতি ভরি সোনার দাম দাঁড়ায় দুই লাখ ৮৬ হাজার টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে এরপর দুই দিনের ব্যবধানে ভরিপ্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম কমে যায়। এই ওঠানামা সাধারণ মানুষের কৌতূহল আরও বাড়িয়েছে।

কারণ এক: বৈশ্বিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

সোনার দামের বড় উল্লম্ফনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য—সব জায়গাতেই অনিশ্চয়তার মেঘ। বিনিয়োগকারীরা এমন সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে টাকা রাখতে চান না। তখনই তারা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝোঁকেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে বাণিজ্যনীতি ও শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বিশ্ববাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। যেসব দেশকে তিনি অনুকূল মনে করেন না, তাদের পণ্যে শুল্ক বসানোর ফলে বাজারে ভয় কাজ করছে। এই ভয় থেকেই স্বর্ণের চাহিদা বেড়েছে।

কারণ দুই: যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা

ইউক্রেন ও গাজার যুদ্ধ বিশ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করার ঘটনা। এসব বিষয় ডলারের ওপর আস্থাকে নড়িয়ে দিয়েছে।

যখন ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, তখন বিনিয়োগকারীরা বিকল্প খোঁজেন। স্বর্ণ এখানে পুরোনো কিন্তু পরীক্ষিত ভরসা। ইতিহাস বলছে, দুনিয়া অস্থির হলেই স্বর্ণের দাম বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

কারণ তিন: কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক স্বর্ণ কেনা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণ কেনা বাড়িয়েছে। তারা এখন ডলারনির্ভরতা কমাতে চাইছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ জব্দ হওয়ার ঘটনার পর অনেক দেশ বুঝেছে, রিজার্ভে স্বর্ণ রাখাই বেশি নিরাপদ।

চীন এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম বড় স্বর্ণ ক্রেতা। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়, সাধারণ মানুষও গয়না ও বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ কিনছে। পশ্চিমা দেশগুলোতেও শেয়ারবাজারের অনিশ্চয়তার কারণে স্বর্ণভিত্তিক বিনিয়োগ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

এমনকি কিছু ডিজিটাল মুদ্রা কোম্পানিও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনেছে, যাদের মজুত এখন ছোট কিছু দেশের রিজার্ভের চেয়েও বেশি বলে জানা যায়। এই বাড়তি চাহিদা স্বর্ণের দামকে আরও ওপরে তুলেছে।

তাহলে হঠাৎ সোনার দাম কমল কেন

এত রেকর্ডের পর হঠাৎ দাম কমে যাওয়ায় অনেকেই অবাক হয়েছেন। এর পেছনেও আছে পরিষ্কার কারণ। বাজারে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভে এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে, যিনি সুদের হার কমানোর পক্ষে থাকবেন। এতে ডলার দুর্বল হবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে—এই ভয়ে অনেকে স্বর্ণ কিনছিলেন।

কিন্তু পরে যখন জানা যায়, অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল হিসেবে পরিচিত কেভিন ওয়ার্শকে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তখন সেই ভয় কিছুটা কমে যায়। ফলাফল হিসেবে স্বর্ণ, রূপা ও প্লাটিনামের দাম দ্রুত নিচের দিকে নামে।

দাম কমলেও কেন স্বর্ণ এখনো আকর্ষণীয়

দাম কিছুটা কমলেও স্বর্ণ এখনো গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি দামে রয়েছে। কারণ মূল সমস্যাগুলো এখনো থেকেই গেছে। যুদ্ধ থামেনি, শুল্কনীতি বদলায়নি, আর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও শেষ হয়নি।

স্বর্ণের বড় শক্তি হলো, এটি কারও ঋণের ওপর নির্ভর করে না। শেয়ার বা বন্ডের মতো কোনো প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স এতে প্রভাব ফেলে না। তাই অনিশ্চিত সময়ে এটি অনেকের কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সম্পদ।

বিনিয়োগকারীদের জন্য বার্তা

সাম্প্রতিক বাজার স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, স্বর্ণের দাম যেমন দ্রুত বাড়ে, তেমনি দ্রুত কমতেও পারে। তাই শুধু আবেগে নয়, বুঝে বিনিয়োগ করা জরুরি।

তবে এক কথা নিশ্চিত—বিশ্ব যতদিন অস্থির থাকবে, ততদিন স্বর্ণের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমবে না। নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে থাকা মানুষদের কাছে সোনা এখনও সবচেয়ে ভরসার নাম।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন