কলকাতায় কালীপুজোর রাত মানেই এক আলাদা অনুভূতি। আলো, শব্দ, আতশবাজি—সব মিলিয়ে সেই রাতকে অনেকেই বছরের সবচেয়ে উজ্জ্বল রাত বলে মনে করেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ইংরেজি নববর্ষের রাত যেন সেই পরিচিত ছবিটাকেও পাল্টে দিল। বহু মানুষের চোখে, কালীপুজোর রাতকেও হার মানাল এবারের নিউ ইয়ার নাইট।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই শহরের চারদিক জুড়ে এমন বাজির তাণ্ডব শুরু হয় যে অনেকেরই মনে হয়েছে, কালীপুজোর রাত বুঝি এবার পিছনে পড়ে গেল।
সন্ধে থেকেই শুরু নতুন বছরের হুল্লোড়
প্রতিবছরের মতোই ৩১ ডিসেম্বর সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গেই শহরের বিভিন্ন ক্লাব, রেস্তোরাঁ আর পার্টি ভেন্যুতে শুরু হয়ে যায় নববর্ষ উদযাপন। ডিজে মিউজিক, আলো, নাচ আর হইচইয়ে ভরে ওঠে একের পর এক জায়গা।
যাঁরা ক্লাব পার্টিতে শামিল হননি, তাঁদের অনেকেই বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। পার্ক স্ট্রিট, ধর্মতলা, অ্যালেন পার্ক—এই জায়গাগুলো নতুন বছরের রাতে যেন আলাদা প্রাণ পেয়ে যায়। অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও হাসিমুখে শুভেচ্ছা বিনিময়, মোবাইল হাতে ছবি তোলা, দল বেঁধে হাঁটা—সব মিলিয়ে পথেই হয়ে ওঠে নববর্ষ পালন।
শীতের রাত, উচ্ছ্বাসে ভরপুর শহর
এবার শীতও ছিল বেশ জাঁকিয়ে। ঠান্ডা হাওয়ার কামড়ের মধ্যেও মানুষের উচ্ছ্বাসে কোনও ঘাটতি ছিল না। বরং অনেকের কাছেই এই কনকনে ঠান্ডা নিউ ইয়ারের আনন্দকে আরও একটু বিশেষ করে তুলেছিল।
গরম জামা গায়ে, হাতে কফি বা চা, আর মুখে হাসি—এই দৃশ্যটাই ছিল শহরের নানা প্রান্তে। সন্ধের পর থেকে আনন্দ চলেছে অনেক রাত পর্যন্ত। রাস্তার মাঝেই কেক কাটা, সেলফি তোলা, কাউন্টডাউনের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে শহর যেন ঘুমোতেই চায়নি।
মধ্যরাতের আগেই শুরু আতশবাজির তাণ্ডব
তবে এবারের নিউ ইয়ার নাইটকে আলাদা করে নজরে এনেছে একটি বিষয়। ঘড়ির কাঁটা তখনও রাত ১২টা ছোঁয়নি। তার আগেই বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয়ে যায় আতশবাজি ফাটানো।
সাধারণত কালীপুজো বা দিওয়ালীর দিন মানুষ বাজির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু ইংরেজি নববর্ষের রাতে এত আগে এবং এত বেশি বাজি—তা অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত।
রাত ১২টা বাজার আগেই চারদিক থেকে বিকট শব্দে ফেটে পড়তে থাকে আতশবাজি। এরপর প্রায় রাত ১টা পর্যন্ত একটানা চলে বাজি ফাটানো। অনেক সময় মনে হয়েছে, এই এক ঘণ্টার বাজি যেন কালীপুজোর রাতের সঙ্গেও টক্কর দিচ্ছে।
কালীপুজোর রাতকে ছাপিয়ে বাজির দাপট
যাঁরা বহু বছর ধরে কালীপুজোর বাজি দেখে অভ্যস্ত, তাঁরাও স্বীকার করছেন—এবারের নিউ ইয়ার নাইটের বাজির তীব্রতা ছিল চোখে পড়ার মতো। আতশবাজির সঙ্গে সঙ্গে শীতের আকাশ আলো করে উড়েছে লণ্ঠনও।
রঙিন আলোয় ভরে উঠেছিল আকাশ। মুহূর্তে মুহূর্তে বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠছিল চারপাশ। কোথাও কোথাও এতটাই শব্দ হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল, কালীপুজোর রাতের দৃশ্য যেন আবার ফিরে এসেছে, তবে অন্য দিনে।
একিউআই নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
এখন আর বাতাসের দূষণ নিয়ে মানুষ উদাসীন নন। অনেকেই এখন ‘একিউআই’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। একিউআই বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স মানে বাতাসে দূষণের মাত্রা।
নিউ ইয়ার নাইটের এই এক ঘণ্টার আতশবাজির রোশনাই যে বাতাসের গুণমান বদলে দিয়েছে, তা অনেকেই মানছেন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন, এত বাজির ফলে বাতাসের অবস্থা কী দাঁড়াল, তা ভেবেই চিন্তা হচ্ছে।
শীতের রাতে এমনিতেই বাতাস ভারী থাকে। তার ওপর একটানা বাজি ফাটানোয় ধোঁয়া আর শব্দ—সব মিলিয়ে পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়েছে বলেই মনে করছেন পরিবেশ সচেতন মানুষেরা।
মধ্যরাতে ঘুম ভাঙল অনেকের
এই বাজির আরেকটি প্রভাব পড়েছে শহরের বাসিন্দাদের ওপর। মধ্যরাতে বাজির বিকট শব্দে অনেকের ঘুম ভেঙে যায়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ আর ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা গেছে।
অনেকেই বলছেন, কালীপুজো বা দিওয়ালীর দিন বাজির আওয়াজের জন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকে। কিন্তু ইংরেজি নববর্ষের রাতে এতটা বাজি হবে, সেটা কেউ ভাবেননি। ফলে হঠাৎ শব্দে আতঙ্কিত হয়েছেন অনেকেই।
নির্দিষ্ট সময়ের নিয়ম মানা হয়নি?
আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে এই বাজি নিয়ে। কালীপুজোর সময় বাজি পোড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া থাকে। কিন্তু ইংরেজি নববর্ষের রাতে সেই নিয়মের কোনও তোয়াক্কা করা হয়নি বলেই অভিযোগ উঠছে।
অনেক জায়গায় রাত ১২টার আগেই বাজি শুরু হয়েছে এবং তা চলেছে অনেকক্ষণ ধরে। ফলে নিয়ম মানা হলো কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ মানুষের মধ্যেই।
আনন্দ বনাম দায়িত্ব—দুটোর ভারসাম্য কোথায়
নতুন বছর মানেই আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর উদযাপন। সেই আনন্দে মানুষ মেতে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সঙ্গে দায়িত্ববোধের প্রশ্নটাও উঠছে।
অনেকেই মনে করছেন, আনন্দ করতে গিয়ে যদি অন্যের অসুবিধা হয়, পরিবেশের ক্ষতি হয়, তাহলে বিষয়টা নতুন করে ভাবা দরকার। কালীপুজোর মতো একটি নির্দিষ্ট দিনের সঙ্গে তুলনা টেনে ইংরেজি নববর্ষের রাতের বাজি ফাটানো অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর লেগেছে।
শহরের অনুভূতি: উচ্ছ্বাস আর অস্বস্তি পাশাপাশি
সব মিলিয়ে এবারের ইংরেজি নববর্ষের রাত কলকাতায় ছিল দ্বিমুখী অনুভূতির। একদিকে ছিল আনন্দ, উল্লাস, আলো আর উদযাপন। অন্যদিকে ছিল শব্দদূষণ, ঘুমের ব্যাঘাত আর বাতাসের মান নিয়ে উদ্বেগ।
কেউ বলছেন, “এত বছর কালীপুজোর রাত দেখেছি, কিন্তু নিউ ইয়ারে এমন বাজি এই প্রথম।” আবার কেউ বলছেন, “নতুন বছর তো বছরে একবারই আসে, একটু তো চলতেই পারে।”

