Homeবিশেষ প্রতিবেদনখামেনেই হত্যা রহস্য! ‘দাঁতের ডাক্তার’ সেজে কীভাবে কেল্লাফতে করল মোসাদ?

খামেনেই হত্যা রহস্য! ‘দাঁতের ডাক্তার’ সেজে কীভাবে কেল্লাফতে করল মোসাদ?

Share

ইরানের সুপ্রিম লিডার Ayatollah Ali Khamenei–এর মৃত্যুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে ঝড় উঠেছে, তা এখনো থামেনি। শুরু থেকেই অন্তর্ঘাতের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সামনে এসেছে আরও বিস্ফোরক সব দাবি।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা Mossad নাকি দীর্ঘ এক বছর ধরে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিকল্পনায় এই হত্যার নীলনকশা তৈরি করেছিল। শুধু তাই নয়, এই গোটা অভিযানে যুক্ত ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা Central Intelligence Agency–ও—এমন অভিযোগও ঘুরছে বিভিন্ন মহলে।

এই ঘটনার পেছনের কাহিনি শুনলে যেন সিনেমার গল্প মনে হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো কখনো বাস্তবই কল্পনার চেয়ে বেশি নাটকীয় হয়ে ওঠে।

সূত্রের দাবি, মোসাদ প্রথমে সরাসরি খামেনেইকে নিশানা করেনি। তারা লক্ষ্য করেছিল তাঁর ঘনিষ্ঠদের। সেনা কর্মকর্তা, নিরাপত্তা উপদেষ্টা, দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ কর্মী—যাঁরা নিয়মিত তাঁর সংস্পর্শে থাকতেন, তাঁদের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করা শুরু হয়।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, কিছু এজেন্ট দাঁতের ডাক্তার সেজে ইরানের ভেতরে কাজ শুরু করেন। যেসব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দাঁতের সমস্যায় ভুগছিলেন, তাঁদেরই আগে টার্গেট করা হয়। চিকিৎসার নামে নাকি তাঁদের দাঁতে অতি ক্ষুদ্র ‘ট্র্যাকিং চিপ’ বসানো হয়। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই, অথচ সেই চিপ থেকে পাওয়া যায় নির্দিষ্ট লোকেশনের তথ্য।

ভাবুন তো, আপনি দাঁতের ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলেন, আর অজান্তেই আপনার চলাফেরা কেউ ট্র্যাক করছে—শুনতেই গা ছমছম করে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঠিক এই কৌশলেই খামেনেইয়ের আশপাশের ব্যক্তিদের গতিবিধি নজরে রাখত মোসাদ।

এতেই শেষ নয়। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, পেটের অসুখের চিকিৎসকদের মধ্যেও গুপ্তচর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের সময় কিছু ব্যক্তির শরীরে বিশেষ ট্র্যাকিং ডিভাইস বসানো হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে শুধু দপ্তরের কর্মী নয়, খামেনেইয়ের পরিবারের সদস্যদের গতিবিধিও নজরে আসে।

এই কৌশল ছিল ধাপে ধাপে এগোনো এক পরিকল্পনা। সরাসরি টার্গেটকে আঘাত না করে প্রথমে তাঁর চারপাশের বলয় দুর্বল করা—যেন দাবার খেলায় রাজাকে ধরার আগে ঘুঁটিগুলো সরিয়ে দেওয়া।

ঘটনার দিন খামেনেই নিজের দপ্তরেই ছিলেন। প্রশ্ন উঠেছে—এত কড়া নিরাপত্তার মাঝেও কীভাবে নিশ্চিত হলো তাঁর অবস্থান?

সূত্রের মতে, সেদিন দপ্তরে যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছিল, সেখানে উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তার শরীরে আগে থেকেই বসানো ছিল সেই বিশেষ ট্র্যাকিং চিপ। তাঁদের অবস্থান বিশ্লেষণ করেই মোসাদ নিশ্চিত হয় যে খামেনেই দপ্তরের ভেতরেই রয়েছেন। এরপরই হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

এ যেন আধুনিক প্রযুক্তি আর মানব গোয়েন্দা তৎপরতার এক মিশ্র রূপ। সিনেমায় আমরা এমন কাহিনি দেখি, কিন্তু বাস্তবে এমন পরিকল্পনা হলে তা নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দেয়।

শুধু মানব গোয়েন্দা নয়, সাইবার দিক থেকেও প্রস্তুতি চলছিল কয়েক মাস আগে থেকেই। অভিযোগ রয়েছে, ইরানের বিভিন্ন ট্রাফিক ক্যামেরা ও সিসিটিভি সিস্টেম হ্যাক করা হয়েছিল। এমনকি খামেনেইয়ের দপ্তরের আশপাশের নিরাপত্তা ক্যামেরাতেও অনুপ্রবেশ ঘটে।

এর ফলে কে কখন কোথায় যাচ্ছে, কোন গাড়ি ঢুকছে বা বের হচ্ছে—সব তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়। আধুনিক যুগে যুদ্ধ শুধু বন্দুক আর বোমায় সীমাবদ্ধ নেই। তথ্যই এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র। যার কাছে তথ্য, তার হাতেই নিয়ন্ত্রণ।

সাইবার নজরদারির মাধ্যমে গোটা নিরাপত্তা বলয়ের একটি ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে সম্ভাব্য দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করা সহজ হয়ে পড়ে।

এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ইরান সরাসরি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ দায় স্বীকার করেনি, কিন্তু কূটনৈতিক টানাপোড়েন চরমে ওঠে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এমনিতেই অস্থির। তার ওপর এমন উচ্চপর্যায়ের নেতাকে ঘিরে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই সব দাবি কতটা সত্য? গোয়েন্দা সংস্থার কার্যকলাপ সাধারণত গোপন থাকে। ফলে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন। অনেক সময় রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতেও এমন তথ্য সামনে আনা হয়।

তবে যদি অভিযোগের সামান্য অংশও সত্য হয়, তাহলে তা আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই নতুন নতুন ফাঁক তৈরি হচ্ছে। একদিকে সুরক্ষা জোরদার করা হচ্ছে, অন্যদিকে সেই সুরক্ষা ভাঙার নতুন উপায়ও বের হচ্ছে।

খামেনেই হত্যাকাণ্ড ঘিরে যে সব তথ্য সামনে এসেছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। দাঁতের চিকিৎসকের ছদ্মবেশ, শরীরে ট্র্যাকিং চিপ, সাইবার হামলা, সিসিটিভি হ্যাকিং—সব মিলিয়ে এটি এক জটিল ও বহুমাত্রিক গুপ্তচর কাহিনি।

বাস্তবতা যাই হোক, এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে—আজকের পৃথিবীতে ক্ষমতার লড়াই শুধু সীমান্তে হয় না। তা হয় হাসপাতালের চেম্বারে, কম্পিউটারের সার্ভারে, এমনকি মানুষের শরীরের ভেতরেও।

আগামী দিনে এই ঘটনার আরও তথ্য সামনে এলে আন্তর্জাতিক কূটনীতি কোন দিকে মোড় নেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন