Homeজাতীয়বাংলাদেশে পরপর দুইবার ভূমিকম্প: সিলেটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আতঙ্ক

বাংলাদেশে পরপর দুইবার ভূমিকম্প: সিলেটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আতঙ্ক

যদিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবুও আফটারশকের আশঙ্কা মাথায় রেখে সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানো সম্ভব না হলেও সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতনতা অনেক বড় ক্ষতি থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে।

Share

বাংলাদেশে আবারও ভূমিকম্পের কম্পনে কেঁপে উঠল জনজীবন। অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর দুইবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সিলেটসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। সোমবার ভোরে সংঘটিত এই ভূমিকম্প শুধু বাংলাদেশেই নয়, প্রতিবেশী দেশ ভারতের আসাম রাজ্যেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প এবং এর পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা আফটারশকের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ভোরের নীরবতা ভাঙল ভূমিকম্পের কম্পনে

সোমবার (৫ জানুয়ারি) ভোর ৪টা ৪৭ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে প্রথম ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও ঘুমন্ত মানুষ হঠাৎ কেঁপে ওঠা ভবন ও আসবাবের নড়াচড়ায় আঁতকে ওঠেন। এর ঠিক ৩০ সেকেন্ড পর, ভোর ৪টা ৪৭ মিনিট ৫২ সেকেন্ডে দ্বিতীয় দফা ভূমিকম্প সিলেট ও আশপাশের এলাকায় আবারও কম্পন সৃষ্টি করে। পরপর দুইবার কম্পন অনুভূত হওয়ায় অনেকেই এটিকে একটি বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশ ও আসামে একসঙ্গে অনুভূত ভূমিকম্প

এই ভূমিকম্পের প্রভাব শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতের আসাম রাজ্যের বিভিন্ন এলাকাতেও শক্ত কম্পন অনুভূত হয়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ভূমিকম্পের তথ্য নিশ্চিত করেছে। কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশও বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ভোরে একটিই নয়, দুটি আলাদা ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে।

ভূমিকম্পের মাত্রা নিয়ে তথ্য সংশোধন

প্রথমে ইউএসজিএস-এর তথ্যে ভূমিকম্প দুটির মাত্রা দেখানো হয়েছিল ৫ দশমিক ৪ এবং ৫ দশমিক ২। পরবর্তীতে সেই তথ্য সংশোধন করে মাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৫ দশমিক ২ ও ৪ দশমিক ৯। তবে মোস্তফা কামাল পলাশ তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে উল্লেখ করেন, প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ২ এবং দ্বিতীয়টির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। তার মতে, দ্বিতীয় এবং তুলনামূলক শক্তিশালী ভূমিকম্পটি ভারতের আসাম রাজ্যে সংঘটিত হয়।

উৎপত্তিস্থল ও গভীরতা কী বলছে বিশেষজ্ঞরা

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের আসাম রাজ্যের রাজধানী গুয়াহাটির কাছাকাছি মরিগাঁও এলাকা। আমেরিকান ভূতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্প দুটির উৎপত্তিস্থল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গভীরে। এই গভীরতা সাধারণত মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যা বিস্তৃত এলাকায় কম্পন ছড়িয়ে দিতে সক্ষম।

মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প কেন উদ্বেগের

৫ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পকে ভূতাত্ত্বিক ভাষায় মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প বলা হয়। এই ধরনের ভূমিকম্পে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ না হলেও পরবর্তী আফটারশকের সম্ভাবনা থাকে। মোস্তফা কামাল পলাশ সতর্ক করে বলেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আফটারশক অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের সক্রিয় ফল্ট লাইনে বা দেশের অভ্যন্তরে হালকা থেকে মাঝারি কম্পন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

আফটারশক কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

আফটারশক হলো মূল ভূমিকম্পের পর একই এলাকায় ঘটে যাওয়া ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প। অনেক সময় এগুলো প্রথম ভূমিকম্পের চেয়েও বেশি আতঙ্ক তৈরি করে, কারণ মানুষ তখন মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না। দুর্বল বা পুরনো ভবন আফটারশকের সময় বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। তাই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, এই সময় অপ্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে অবস্থান না করতে।

এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভবনের ভেতরে থাকলে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, ভারী আসবাব থেকে দূরে থাকা এবং লিফট ব্যবহার না করার মতো সাধারণ নিয়মগুলো মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি যেকোনো গুজব এড়িয়ে শুধু নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে বাংলাদেশ

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে একাধিক সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে এখনই পরিকল্পিত নগরায়ণ, শক্তিশালী ভবন নির্মাণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

শেষ কথা

পরপর দুইবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি সতর্কবার্তা। যদিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবুও আফটারশকের আশঙ্কা মাথায় রেখে সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানো সম্ভব না হলেও সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতনতা অনেক বড় ক্ষতি থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন